আলঝেইমার রোগঃ একটি পর্যালোচনা

ডিমেনশিয়ার লক্ষণ ও পরিচয়

সকল দেশেই বয়স্কদের মধ্যে ভুলপ্রবনতা একটি সাধারন ও স্বাভাবিক ব্যাপার। একই বিষয়ে বার বার ভুল করা, স্মরণ করিয়ে দিলেও সংশোধন না হওয়া, সবকিছু শিখিয়ে দিলেও গুছিয়ে কোন বিষয় উপস্থাপন করতে না পারা, সময়, স্থান, রাস্তা ভুল করা, অভ্যাসগত সাধারন কাজের সিকুয়েন্স ভুলে যাওয়া প্রভৃতি স্মৃতিহীনতার লক্ষন। স্মরণ করিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে যদি সংশোধন করতে পারে তাহলে তা দোষের নয় বা কোন রোগও নয়। বয়সের সাথে দৃষ্টিকটুভাবে অসামন্জস্যপুণ অস্বাভাবিক মাত্রার ভুলপ্রবনতা যখন কারো দৈনন্দিন ব্যক্তিগত জীবনকে অচল ও পরমুখাপেক্ষি করে তোলে তখন সেটাকে ডিমেনশিয়া হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এমন ব্যক্তির উপর গুরুত্বপুর্ন বিষয়ে আর আগের মত নির্ভর করা যায় না। ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তাঁর নিজের বা পরিবারের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়। সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তা কম্যাণ্ড, কন্ট্রোল, ডিকটেটশন এবং ডিরেকশন ভুলপথে চালিত করে এবং সেই সুযোগে কোন অশুভ শক্তি নেতৃত্বকে ব্যবহার করে অস্থিরতা ও অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু কলংকের ভয়ে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই এসব বিষয় গোপন রাখা হয়।

রোগের ইতিহাস
ডাঃ এলইস আলঝেইমার ১৯০৬ সালে প্রথম এই রোগের বর্ণনা দেন (1)। আগস্তি দেতার অলীক দর্শন ও ভাবনা, স্মৃতিগত দুর্বলতা, কথা বলতে কষ্ট হওয়া, সঠিক শব্দটি স্মরণ করতে না পারা, খিটখিটে মেজাজ, রাগ, অসহিঞ্চুতা, সন্দেহ প্রবনতা, ইত্যাদি সমস্যায় ভুগছিলেন। মৃত্যু পরবর্তী পরীক্ষায় তার ব্রেন ছিল চুপসে যাওয়া ছোট, স্নায়ুতন্তু সমুহ এমাইলয়েড প্ল্যাক দ্বারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত আর অবশিষ্ট নিউরনগুলো নিউরোফিব্রিলারী ট্যাঙ্গেলে ভরপুর। পরবর্তীকালে এজাতীয় রোগের নামকরন করা হয় আলঝেইমার রোগ।

এপিডেমিওলজী 
বয়স ৬০ বছরের পর থেকে প্রতি ৫ বছরের মধ্যে আলঝেইমার হবার আশংকা দ্বিগুণ হতে থাকে। ১৯৯৩ সালে পরিচালিত ফ্রামিংহাম ষ্টাডিতে ৬৫ থেকে ৬৯ বছর বয়সীদের প্রতি হাজারে ৭ জনের এবং ৮৫ থেকে ৮৯ বছরের মানুষের প্রতি হাজারে ১১৮ জন ব্যক্তির মধ্যে আলঝেইমার রোগ রেকর্ড করা হয় (2)। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবার কেন্দ্রিক ডিমেনশিয়া দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার সুত্রপাত ঘটে অল্প বয়স থেকেই আর জীনগত ট্রাইজোমি ডাউন্স সিনড্রোমে আলঝেইমারস একটি বিরল কিন্তু প্রমানিত সত্য। গড় আয়ুর পাশাপাশি আলঝেইমারস এর প্রকোপ উন্নয়নশীল বিশ্বে বাড়ছে (3)। দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া যে কোন রোগ, ডায়াবেটিস এবং মহিলাদদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশী (4)। যুক্তরাষ্ট্রে আলঝেইমার রোগ মৃত্যুর ৬ষ্ঠ কারন হিসাবে চিহ্নিত।

প্যাথোজেনেসিস 
আলঝেইমার ডিমেনশিয়ার প্যাথোলজী হচ্ছে নিউরনের অভ্যন্তরে নিউরোফিব্রিলারি ট্যাঙ্গেল (NFT) এবং বাহিরে এমাইলয়েড প্ল্যাকের (AP)উৎপত্তি। এসবের মুলে রয়েছে নন-এনজাইমেটিক গ্লাইকেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড প্রডাক্ট (AGEs) জমা হওয়া। গ্লুকোজের পরিমান স্বাভাবিক থাকলে ধীর গতিতে এবং বেশী থাকলে দ্রুত গতিতে এসব পরিবর্তন ঘটতে থাকে (5)। AGEs বিশিষ্ট প্ল্যাক এবং ট্যাঙ্গেল সমুহ রিএকটিভ অক্সিজেন ইন্টারমিডিয়েট তৈরীর মাধ্যমে নিউরন এবং সেগুলির আন্তসংযোগ (Synapse) নষ্ট করে দেয় (6)। ব্রেনে আপাত বা প্রকৃত ইনসুলিন ঘাটতির কারনে এসব ঘটে বলে আলঝেইমার রোগকে টাইপ থ্রি ডায়াবেটিস বলা হয় (7)।

ইনভেষ্টিগেশন
আলজেইমারস এর জন্য বিশেষ কোন টেস্ট নেই। রুটিন পরীক্ষার ফলাফল সাধারনতঃ স্বাভাবিক থাকে। ব্রেনের সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় বয়স জনিত ক্ষয় (এট্রফি) ধরা পরতে পারে, এম আর আই তে হিপ্পোক্যাম্পাল এট্রোফি পাওয়া যেতে পারে। পি ই টি পরিক্ষায় ব্রেনের কার্যক্ষমতার হ্রাস দেখা যায়। পোস্ট মর্টেম ব্রেন পরীক্ষায় প্রাপ্ত আলঝেইমার জনিত সকল পরিবর্তন বয়স্কদের মধ্যে পাওয়া যায়।

ডায়াগনোসিস
আলঝেইমার রোগ মুলতঃ লক্ষন সমষ্টি দেখে সিন্ড্রোমিক ডায়াগনোসিস করা হয় । প্রাথমিক অবস্থায় লক্ষন প্রকট থাকে না তবে মিনিমেন্টাল টেস্ট স্কোর স্বাভাবিকের নিম্নমানে থাকে এবং ফলো আপে সেটা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়। শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে কেবল লক্ষন দ্বারা বিচার করে সঠিক ভাবে রোগটি চিহ্নিত করা যায়। এক্ষেত্রে বয়স বিবেচ্য নয়। তবে ডিমেনশিয়ার অন্যান্য কারনও খুঁজতে হবে। কারণ সবধরনের ডিমেনশিয়া একই রোগীর মধ্যে শুরু হতে পারে এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাইপারটেনশন, ইত্যাদি এক বা একাধিক রোগ ডিমেনশিয়ার সাথে যুক্ত থাকতে পারে। শুধুমাত্র অপেক্ষাকৃত ইয়ং বয়সীদের মধ্যে পিউর আলঝেইমারস পাওয়া বা ডায়াগনোসিস করা যতটা সম্ভব ও নিরাপদ, বৃদ্ধ বয়সে অন্য সকল রোগ থেকে মুক্ত বিশুদ্ধ আলঝেইমারস বা ডিমেনশিয়া খুজে পাওয়া প্রায় ততটাই অসম্ভব।

স্বভাবতই প্রতিটি ক্ষেত্রে ডায়াগনোসিস না হলেও মিস-ডায়াগনোসিস বা ভুল ডায়াগনোসিসের সম্ভাবনা শতভাগ থাকছে। প্রায়ই আলঝেইমারস রোগীর কবে থেকে ডিমেনশিয়া শুরু হয়েছে তা মোটেই জানা থাকে না। স্মৃতিভ্রষ্টতা উপসর্গটি প্রথম নোটীশে আসে যখন তাকে কোন ইনফেকশন, জ্বর, বমি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদির কারণে চিকিৎসার জন্য আনা হয় ও হাইয়ার সেরিব্রাল ফাংশনে গ্রস ত্রুটি ধরা পরে। তবে ডিমেনশিয়ার ডায়াগনোসিস মাথায় না থাকলে এবং ভুল বকা শুরু হলে সেটা মিস-ইন্টারপ্রিট করা হয় শক, ভাইরাল এনকেফালাইটিস, কমা, স্ট্রোক, TBM, এজোটেমিয়া বা কোন ক্রাইসিস হিসাবে। যথাযথভাবে ব্রেন ফাংশন টেষ্ট করা হলে এরকম ভুল হবার কারন থাকতো না। অতঃপর শুরু হয় উন্নত চিকিতসার নামে প্রচুর দামী পরীক্ষা, দুর্মুল্য এন্টিভাইরাল ইনজেকশন আর ঔষধ, আই সি ইউ সেবা আর অর্থের শ্রাদ্ধ। ফলাফল যথারীতি শূণ্য।

ডায়াগনোসিস মেনে নেবার ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডিমেনশিয়াকে একটি কলঙ্ক বিবেচনা করে চিকিৎসক বা রোগীর পরিবার সেটা গোপন রাখার চেষ্টা চালাতে পারেন। তবে খুব বেশীদিন একে লুকিয়ে রাখা যায় না। একসময় যখন থলের বিড়াল বেড়িয়ে পড়ে তখন দেশী-বিদেশী কোন ব্যবস্থাই কাজে আসে না। এদেশে কোন বিশেষজ্ঞ আলঝেইমার ডায়াগনোসিস করেন না, করতে পারেন না বা করতে চান না। ডায়াগনোসিস না করলে চিকিৎসার প্রশ্নই আসে না। সময় থাকতে রোগনির্ণয় করা এবং ডায়াগনোসিস এক্সেপ্ট করা অতীব জরুরী। রোগীর বা পরিবারের জন্য কলঙ্ক হিসাবে না ধরে সহজভাবে মেনে নিতে পারলে সময়ের সদ্ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা, পরিচর্য্যা এবং সহায়তা পরিকল্পনা প্রনয়ন সহজ হয়।

চিকিৎসা
প্রাথমিক পর্যায়ে রিভাস্টিগমিন, গ্যালান্টামিন, ডনেপেজিল বা মেমান্টিন জাতীয় কিছু ঔষধ রোগীর স্মৃতিশক্তি অল্প কিছুদিন ধরে রাখতে সাহায্য করে বটে কিন্তু সময়ের সাথে কার্যকারিতা হ্রাস পায় (8)। এসব ঔষধ ক্যাপসুল, প্যাচ, ট্যাবলেট বিভিন্ন ভাবে পাওয়া যায়। তবে দুর্লভ, ব্যয়বহুল, সর্বদা সেব্য, সাইকিয়াট্রিক প্রতিক্রিয়াযুক্ত এবং প্রান্তিকভাবে অকার্যকর। সেলিজিলিন, এন্টি-অক্সিডেন্টস, স্ট্যাটিনস(9), মেটফরমিন ইত্যাদি লং টার্ম বেনিফিটের জন্য দেওয়া যেতে পারে তবে পেশেন্ট কমপ্লায়েন্স না থাকলে উপকারে আসবে না ।

এসব রোগীকে এন্টিসাইকোটিক প্রয়োগে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। রোগের জন্য যতটা না তার চেয়ে বেশী মেন্টাল ইনস্ট্যাবিলিটি জন্মে ঔষধের প্রতিক্রিয়া হিসাবে। প্রায়ই এধরনের রোগকে মনোরোগ হিসাবে ধরে পাগলের চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে এন্টি-সাইকোটিক জাতীয় ঔষধে ব্রেনের ক্ষতি ত্বরান্বিত হয়। মানসিক রোগ সেটাকেই বলা হয় যেখানে ব্রেন স্ট্রাকচার স্বাভাবিক কিন্তু আচরন অস্বাভাবিক থাকে। আলঝেইমারস ব্রেনের ক্ষয়জনিত রোগ, এটা কোন মানসিক রোগ নয়। মানসিক ঔষধ দিয়ে, রোগীকে বেধে রেখে বা কোন শাস্তি দিয়ে সংশোধন করার চেষ্টা করা যাবে না। ক্ষেত্রবিশেষে ব্রেনের নিউরোট্রান্সমিটার মডুলেট করে আচরন গ্রহনযোগ্য পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।

যেহেতু ডিমেনশিয়া বয়স্কদের রোগ তাই বয়স জনিত বিভিন্ন রোগ থাকতে পারে। তেমনি নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি একই সাথে আলঝেইমারস রোগেও ভুগতে পারেন। সব রোগের সাথে ডিমেনশিয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে এবং ডিমেনশিয়ার সহগামী রোগসকল বিবেচনায় নিয়ে বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসা করা প্রয়োজন। প্রান্তিক পর্যায়ে সব সিস্টেমিক রোগেই ব্রেন আক্রান্ত হয়ে ডিলিরিয়াম তৈরী করে। কথা ও কাজের অসংলগ্নতা ক্ষুদ্র সমস্যাকেও বৃহৎ এবং জটিল সমস্যাকেও সাধারন ব্যাপার হিসাবে দাড় করাতে পারে। একজন মরণাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে সাবধান না হলে ভুল সিদ্ধান্ত ও মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এটা অহরহ হচ্ছে যেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগন একেবারেই অজ্ঞ। চিকিৎসকের অজ্ঞতা এক্ষেত্রে এমন পর্য়ায়ে যে আমাদের দেশে মৃত্যু তালিকায় আলঝেইমারসের স্থান নেই অথচ আমেরিকায় তার অবস্থান ৬ নম্বরে।

বিষয়টি মাথায় রেখে কনকমিট্যান্ট রেনাল, ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রিন বা মেটাবলিক প্রব্লেম, হাইপারটেনশন, হৃদরোগ, নিউট্রিশন ইত্যাদি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রন করতে হবে। পলিফার্মেসী যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। বোর্ডের চেয়ে অালঝেইমার বিশেষজ্ঞ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যে কোন ঔষধের ক্ষেত্রে ব্রেন ফাংশনের উপর তার এডভার্স এফেক্ট বিবেচনায় নিতে হবে। ইলেক্ট্রোলাইট ইম্ব্যালেন্স বা ব্রেন ফাংশন ইম্পেয়ার করে এ ধরনের কোন ঔষধ প্রয়োগ করা যাবে না। অসুস্থ ব্রেনকে রিকভারির চেষ্টাই অাগে দরকার। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সযত্নে ডাইউরেটিক ও স্টেরয়েড পরিহার, প্রেসার না বাড়ে, না কমে এমন ঔষধ সিলেক্ট করা (e.g CCB+ACEI), ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ট্যাবলেটের স্থলে ইনসুলিন প্রয়োগে দীর্ঘমেয়াদী ইনসুলিন ডেফিসিয়েন্সী জনিত ব্রেনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠা অনেকটা সম্ভব হয় (10)। আলঝেইমারসের সঙ্গে অন্য রোগ যুক্ত থাকলে বরং চিকিৎসার সাফল্য লাভের সম্ভাবনা অধিক। প্রয়োজন সঠিক রোগ, ঔষধ ও তার মাত্রা নির্ধারন এবং সময়ানুযায়ী যথাযথ প্রয়োগ।

ফলো আপ
প্রথম দিকে রোগ লক্ষন মৃদু থাকলেও পরবর্তীকালে সেগুলি অধিক স্পষ্ট হয়ে উঠে এবং ডায়াগনোসিস আরো নিশ্চিত হয়। স্মৃতি সহায়তায় ডায়েরী বেশ কার্যকর। ডিজেনেরাটিভ স্নায়ুরোগের ব্যাপারে রোগী, আত্মীয় সবজন ও পরিচর্যাকারীদের যথাযথ ব্যখ্যা, পরামর্শ ও প্রশিক্ষন দানের দরকার হয়। নিয়মিত পুনর্মুল্যায়ন, চিকিতসার সাফল্য পর্যালোচনা এবং নব উদ্ভুত লক্ষন ও সমস্যার ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থাপনা দরকার হয়। বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার মানসিকতা তৈরী করতে হবে। রোগীর পারিবারিক ঝামেলার বিষয়সমুহ, আর্থিক স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির যথাযথ বন্টন ও ব্যবহার রোগীর স্মৃতিশক্তি যথেষ্ট বর্তমান থাকার সময়েই সম্পাদন করতে হবে। বিপজ্জনক বিষয় এড়িয়ে শান্ত ও বন্ধুসুলভ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অবনতিশীল পরিস্থিতিতে হাসপাতাল, ক্লিনিক বা নার্সিং হোমে স্থানান্তর করতে হতে পারে।

পরিচর্যা
সাপোর্ট এবং কেয়ার এ রোগের চিকিতসার অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য্য অংশ। লক্ষনভিত্তিক ঔষধের পাশাপাশি সেবা ও পরিচর্যা, ভালবাসা, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক সাহায্য প্রয়োজন হবে। এসব রোগীর ব্রেন স্মৃতিশক্তি হারালেও অনুধাবনের শক্তি, ইগো, সম্মানবোধ এবং ব্যক্তিত্ব হারান না। তিনি কোন অবহেলা, অযত্ন বা দুর্ব্যবহার আশা করেন না। নিজের অক্ষমতার জন্য তিনি উতকন্ঠিত, উদ্বিগ্ন থাকেন এবং অসহায় বোধ করেন। তিনি একজন বিশবস্ত সাহায্যকারী সঙ্গী আশা করেন। প্রিয়জন থেকে দূরে থাকতে ও অপরিচিতকে ভয় পান। কোনমতেই তার প্রিয় পরিচর্যাকারীকে তাকে ছেড়ে কোথাও যেতে দিতে চান না।

তার প্রিয়জন ও পরিচর্যাকারীকে এই বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। তার রোগ ভাল হবে না, ক্রমশঃ খারাপ হবে, প্রিয়জন বা পরিচর্যাকারীকে চিনতে পারবেন না, তাদের সাথে বিনা কারণে দুর্ব্যবহার করবেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে তা হবে বিপর্যয়কর, সামাজিক দিক থেকে অবমাননাকর, অথচ সবকিছু সহ্য করে মৃত্যু পর্যন্ত তার সেবা করে যেতে হবে। স্ত্রী হলেন এসব ক্ষেত্রে মুখ্য দায়িত্ব পালনকারী যিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় এসব যন্ত্রনা সহ্য করে থাকেন। কিন্তু স্ত্রীগনও অনেক সময় বয়সের ভারে ন্যুব্জ থাকেন, বিভিন্ন রোগে ভোগেন এবং সদিচ্ছা থাকলেও স্বামীদেরকে যথাযথ সেবা করতে পারেন না। সন্তান-সন্ততিগণ ব্যস্ত জীবন যাপন করেন। নাতি নাতনিগন লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তবে তাদের ভুমিকা অতীব গুরুত্বপুর্ন কারন তাদের সেবাকে দাদা-দাদী খুবই পছন্দ করেন, বন্ধু হিসাবে মনে করেন, বিশ্বাস করেন এবং ভালবাসেন।

বেতনভোগী পরিচর্যাকারীগনকে অনেক রোগী মোটেই আপন হিসাবে গ্রহন, পছন্দ ও সহ্য করতে পারেন না। পরিচর্যাকারী পরিবর্তন হলে তারা রেগে যান ও দুর্ব্যবহার করেন। একই পরিস্থিতি পরিচর্য্যাকারীর ক্ষেত্রেও সত্য এবং পেশেন্ট এবিউজের বিষয়টিও এখানে জড়িত থাকে। একপর্যায়ে প্রায়ই পরিচর্যাকারীগন পালিয়ে যান অথবা রোগীর অক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্নভাবে স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত থাকেন।

পরিচর্যাকারীর সহায়তা
একজন পরিচর্যাকারী নিজের পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনকে এড়িয়ে শুধু ডিমেনশিয়াগ্রস্ত ব্যক্তির সেবা করবেন এটা রোগী চাইলেও কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। রোগ ভাল হচ্ছে না, দিন দিন খারাপ হচ্ছে, এ ধরণের রোগীর সেবা করতে গিয়ে পরিচর্যাকারী নিজের জীবন সম্পর্কেও নিরাশ হয়ে পড়েন। মানসিক ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, বিসন্ন ও অসহায় বোধ করেন। পেশাগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও ক্ষতিগস্ত হন। তার জন্য যথাযথ প্রশিক্ষন সহ যথেষ্ট পরিমান সাহায্য ও সহযোগীতার ব্যবস্থা করা না হলে তিনি একাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন এবং যদি রোগীকে ত্যাগ করে চলে যান তাহলে তার অবস্থা সঙ্গীন হয়ে দাঁড়ায়। শুধুমাত্র নিঃস্বার্থ, প্রশিক্ষন প্রাপ্ত পরিচর্যাকারিগনই এক্ষেত্রে নিরাপদ বিবেচিত হতে পারেন।

প্রস্তাবনা
স্বাভাবিক ভাবেই এ সমস্যার সহজ কোন সলিউশন নেই। তাই দরকার রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য (১১)। সমস্যার ব্যপকত্ব ও বিস্তৃতি অনুধাবন করতে পারলে তা মোকাবিলা সহজ হয়।

অালঝেেইমার সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ASB) একটি জাতীয় সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠান হিসাবে ডিমেনশিয়া বিষয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপুর্ন অবদান রেখে চলেছ। ডিমেনশিয়া সংক্রান্ত তথ্য, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও পরিচর্যাকারীর সহায়তা প্রদানের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ডিমেনশিয়া সার্ভিস এন্ড ইনফরমেশন সেন্টার (DSIC) স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল, এক্ষেত্রে অাপনাদের সকলের সব ধরনের সাহায়্য-সহায়তা প্রয়োজন। তাছাড়া একটি পূর্ণাংগ ডিমেনশিয়া রিসার্চ ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতাল (DRIH) প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবী। ডিমেনশিয়ার পাশাপাশি তার জন্য দায়ী সকল কন্ডিশন আইডেন্টিফাই, ট্রিটমেন্ট ও মিটিগেট করার পাশাপাশি একটি আদর্শ চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটা কাজ করবে।

উন্নত দেশ সমুহে ইতিমধ্যেই ডিমেনশিয়াকে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত স্বাস্থ্য সেবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ডিমেনশিয়া এদেশে নেই বলে চিৎকার করলেই সমস্যা দূর হয়ে যাবে না। একে কলঙ্ক হিসাবে না দেখে, বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নিজের ও সমাজের ভবিষ্যৎ মঙ্গলের লক্ষে পরিকল্পনা ও বাজেট প্রনয়ন করতে হবে। সরকারের স্বাস্থ্য ও সমাজ সেবা মন্ত্রনালয় সমুহকে বিষয়টি অতীব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার অনুরোধ জানাচ্ছি।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মত আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতেও ডিমেনশিয়াগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা এবং বাজেট নেয়া হয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে বেঁচে থাকলে ডিমেনশিয়া হবেই। কাজেই মান-সম্মান রক্ষার্থে নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিদ্যমান নেতৃত্ব এখনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন এ প্রস্তাব রাখছি।

Dr Md Shariful Islam MBBS, M Phil, MD.
Assistant Professor and Head of the Department of Neurology
Rangpur Medical College & Hospital
Rangpur, Bangladesh.
Adviser, Alzheimer Society of Bangladesh.

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *