কিডনি রোগের কারন ও লক্ষণ সমুহ দেখুন

কিডনি আমাদের শরীরের দু’টি প্রয়োজনীয় অঙ্গ। দেখতে অনেকটা সিমের বীজের মতো বা অনেকটা বাংলা ৫ অঙ্কের আকার। মানবদেহের পাঁজরের ঠিক নিচে পেটের পেছন দিকে মেরুদণ্ডের দু’পাশে দু’টি কিডনি থাকে। বাম কিডনিটি ডান কিডনি অপেক্ষা সামান্য বড় এবং কিছুটা ওপরে থাকে। কিডনি হলো শরীরের পরিশোধনাগার। প্রতিদিন কিডনি প্রায় ২০০ লিটার রক্ত শোধন করে দুই লিটার রেচন পদার্থ মূত্র থলিতে জমা করে, যা মূত্রাকারে শরীর
থেকে বেরিয়ে যায়। কিডনি তার ছাঁকনির মাধ্যমে রক্তকে পরিশোধিত করে অপ্রয়োজনীয় দূষিত পদার্থ মূত্রের মাধ্যমে বের করে দিয়ে আমাদের শরীরকে সুস্খ রাখে। যদি কোনো কারণে কিডনি রক্ত থেকে সেই দূষিত পদার্থ অপসারণ করতে না পারে, তবেই শরীর নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।  ২০ শতাংশ কার্যক্ষম একটি মাত্র কিডনিই একজন মানুষকে সুস্খ রাখতে সক্ষম।

কিডনি রোগের লক্ষণ :

১. ক্লান্ত, দুর্বল: আপনার কিডনি নিস্ক্রিয় থাকলে দূষিত রক্তকে ঠিকভাবে শোধন করতে পারে না। যে কারণে আপনি সবসময় ক্লান্ত এবং দুর্বল অনুভব করতে পারেন।

২. ঘুমে সমস্যা: কিডনি যখন ঠিকঠাক ভাবে কাজ করে না তখন রক্ত ঠিকভাবে পরিশোধিত হয় না, যা আপনার ঘুমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

৩. ত্বক শুকনো এবং ফাটলের চিহ্ন: কিডনি যখন আপনার শরীরের মিনারেল এবং নিউট্রেশনকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না তখন আপনার ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় এবং অনেকক্ষেত্রে ত্বকে ফাটলের সৃষ্টি হয়। এরকম কোন লক্ষণ দেখলে আপনার উচিত কিডনি বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা।

৪. প্রসাবের অতিরিক্ত চাপ: আপনি যদি প্রসাবের অতিরিক্ত প্রসাবের চাপ অনুভব করেন এবং বিশেষ করে রাতে তবে এটা আপনার কিডনী রোগে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ।

৫. প্রসাবে রক্ত: কিডনী যখন কার্যক্ষম থাকে তখন রক্ত পরিস্কারের সময় দূষিত পদার্থগুলোকে প্রসাবের সাথে বের করে দেয় এবং রক্তকে এর থেকে আলাদা করে। কিন্তু কিডনী যখন সঠিকভাবে কাজ করে না তখন ছাকনের সময় প্রসাবের সাথে রক্ত বের হয়ে যেতে পারে।

৬. প্রসাবে ফেনা: ডিমকে ফেটানোর সময় উপরের দিকে যেরকম ফেনার সৃষ্টি হয় আপনার প্রসাবের সময় যদি এরকমটি হয় তবে আপনার চিকিৎসকের বশবর্তী হওয়া উচিত।

৭. চোখের পাশে ফোলাভাব: আপনার চোখের পাশে যদি ফোলাভাব থাকে তবে আপনার কিডনী হয়তো প্রোটিনকে শরীরর জন্য ধরে রাখতে না পেরে প্রসাবের সাথে বের করে দিচ্ছে। শরীর থেকে অতিরিক্ত প্রোটিন নি:সরনের ফলে আপনার চোখের পাশ ফুলে যেতে পারে, যা আপনার কিডনী রোগে আক্রান্ত হওয়াকে নির্দেশ করে।

৮. পায়ের গোড়ালী এবং পাতা ফোলা: কিডনী ঠিক ভাবে কাজ না করলে শরীরে সোডিয়ামের পরিমান বেড়ে যায় এবং এরফলে আপনার পায়ের গোড়ালী এবং পাতা ফুলে যেতে পারে।

৯. ক্ষুধামন্দা: ক্ষুধামন্দা হওয়া কিডনী রোগের অন্যতম একটি লক্ষণ।

১০. পেশিতে ব্যাথা: শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি এবং ফসফরাসের নিয়ন্ত্রন ঠিকভাবে না হলে পেশিতে ব্যাথা অনুভূত হয়, যা কিডনী রোগে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ।

এছাড়াও যে লক্ষনগুলো দেখা যায়

ক) ব্যথা : সাধারণত খুব মৃদু ব্যথা পেটের
পেছনে মেরুদণ্ডের দু’পাশে এবং পেটের মাঝখানে নাভির
কাছে। কিডনি পাথরের বেলায় ব্যথা তীব্র হতে পারে।
খ) প্রায়ই মাথা ব্যথা।
গ) বমি-বমিভাব এবং বমি করা। ঘ) প্রস্রাব করতে ব্যথা এবং জ্বালাপোড়া।
ঙ) বারবার প্রস্রাব হওয়া। অথবা হঠাৎ প্রস্রাবের
পরিমাণ কমে যাওয়া।
চ) চুলকানি/খোস-পাঁচড়া।
ছ) ক্ষুধা না পাওয়া ও ক্লান্তিবোধ করা।
জ) মুখ, বিশেষত চোখের নিচে, হাত, পা অথবা সর্বশরীর ফুলে যাওয়া।
ঝ) উচ্চ রক্তচাপ ও রক্ত শূন্যতা।
যেহেতু কিডনি রোগ অনেক প্রকার, তাই লক্ষণও
ভিন্ন ভিন্ন। প্রথমাবস্খায় কিডনি রোগে প্রায়ই
কোনো লক্ষণ থাকে না বা সামান্য থাকে।
কখনো কখনো কোনো লক্ষণ প্রকাশের আগেই রোগীর কিডনি ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় কিছু
পরীক্ষার দ্বারা কিডনির রুটিন চেকআপ জরুরি। প্রস্রাবের
পরীক্ষা, রক্তের বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষা, এক্স-রে,
আলট্রাসাউন্ড এবং প্রয়োজনে বায়োপসি দ্বারা কিডনি রোগ
নির্ণয় করা যায়।
কিডনি রোগের জটিলতা : কিডনির রোগ মানে কিডনির কাজ ব্যাহত হওয়া। যার ফলে যে সব রোগ
দেখা দিতে পারে সেগুলো হচ্ছে : ডায়াবেটিস,
হাইপারটেনশন, নেফন্সাইটিস, সংক্রামণ, পাথর হওয়া,
আঘাত প্রাপ্তি ইত্যাদি।

লক্ষ্মণ প্রকাশ ছাড়াই নষ্ট হয়ে যেতে পারে অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ কিডনি (বৃক্ক)। ফলে নষ্ট না হলে আমাদের দেশে সাধারণত কেউ কিডনি-সংক্রান্ত কোনো চিকিৎসা বা পরীক্ষা করতে যায় না। কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি এমন একটি অঙ্গ যা ৭০ শতাংশ নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কোনো লক্ষ্মণ প্রকাশ করে না। সে জন্য সবাই উচিত কিডনির প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে জেনে নেয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ এ অঙ্গটি কী অবস্থায় আছে।

১৫ কোটি মানুষের মধ্যে ২ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি জটিলতায় ভুগছে। সময়মতো শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা দিতে পারলে ৭০ শতাংশই সুস্থ হয়ে উঠতে পারে। নষ্ট হয়ে গেলে ডায়ালাইসিস ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। বিকল্প হলো  কিডনি প্রতিস্থাপন করা। ডায়ালাইসিস অথবা প্রতিস্থাপন দুটো চিকিৎসাই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জটিলতা থেকে মুক্ত থাকতে হলে বছরে কমপক্ষে একবার করে কিডনি পরীক্ষা করিয়ে নেয়া উচিত।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *