কীভাবে জানবেন জরায়ু-মুখের ক্যান্সার?

মহিলাদের শরীরে যে অঙ্গে সন্তান ধারণ হয় তাকে জরায়ু বলে। এই জরায়ুর নিম্নভাগের অংশকে সারভিক্স বা জরায়ু-মুখ বলে। জরায়ু-মুখের ক্যানসার বা সারভাইকাল ক্যানসার খুবই বিপজ্জনক।

মহিলাদের শরীরে যে অঙ্গে সন্তান ধারণ হয় তাকে জরায়ু (ইউটেরাস) বলে। এই জরায়ুর নিম্নভাগের অংশকে সারভিক্স বা জরায়ু-মুখ বলে। জরায়ু-মুখের ক্যানসার বা সারভাইকাল ক্যানসার খুবই বিপজ্জনক। সারা পৃথিবীতে সারভিক্সের ক্যানসার মহিলাদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যায় ঘটে। প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫লক্ষ ২৮হাজার মহিলা এই ক্যানসারে আক্রান্ত হন, আর তার মধ্যে ২লক্ষ ৬৬হাজার মহিলার মৃত্যু হয় সারভাইকাল ক্যানসারের কারণে।

জরায়ুমুখের ক্যানসার কীভাবে হয়?

মহিলারা যৌন সংসর্গ শুরু করলে যোনিদ্বারে এক ধরনের জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে, যাকে বলে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচ পি ভি); এই ভাইরাস সংক্রমণ প্রাথমিক অবস্থায় কোনও ক্ষতি করে না। বেশিরভাগ মহিলার শরীরে এই ভাইরাস অনেক বছর ধরে থেকে যায়, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এর কারণে জরায়ু-মুখে প্রথমে এক ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়, যাকে বলা হয় ডিসপ্লাসিয়া। এটি ক্যানসার পূর্ববর্তী অবস্থা, যা সঠিক সময়ে ধরা না গেলে এবং চিকিৎসা না হলে বেশ কয়েক বছর পরে ক্যানসারে পরিবর্তিত হতে পারে এবং ৮-১০ বছর সময় লাগে।

জরায়ুমুখের ক্যানসার কাদের হয়?

যেহেতু এইচ পি ভি সংক্রমণ যে-কোনও বিবাহিত মহিলাদের হতে পারে,‍‌ সেজন্য সব বিবাহিত মহিলার জরায়ু-মুখের ক্যানসার হবার ঝুঁকি আছে। যেসব মহিলার অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে বা অধিক সংখ্যক সন্তান আছে, তাদের এই ক্যানসারের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যেসব মহিলা ইমিউনো সাপ্রেসিভ ওষুধ খান, যেমন কিডনি প্রতিস্থাপনের পরে এই ধরনের ওষুধ দেওয়া হয় তাদেরও। সেজন্য জরায়ু-মুখের ক্যানসার হবার সম্ভাবনা বাড়ে। বা যারা এইচ আই ভি সংক্রমণে আক্রান্ত তাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় আর জরায়ু-মুখের ক্যানসার হবার সুযোগ বেড়ে যায়।

জরায়ুমুখের ক্যানসারের উপসর্গ কী?
প্রথম অবস্থায় মহিলাদের সাদা বা জলের মতো স্রাব হয়, যা পরে এই দুর্গন্ধযুক্ত হয় আর ওষুধে সারে না। স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশার পরে রক্ত দেখা দিতে পারে। রক্তস্রাব বেড়ে যেতে পারে কিংবা পিরিয়ড বন্ধ হবার পরে আবার রক্ত দেখা দিতে পারে। ক্যানসার যখন আরও ছড়িয়ে পড়ে তখন পেটে ব্যথা, পিঠে ব্যথা, প্রস্রাবে অসুবিধা দেখা দেয়। তবে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশার পরে রক্ত দেখা দেওয়া জরায়ু-মুখের ক্যানসারের অন্যতম প্রধান উপসর্গ। এই উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জরায়ুমুখের ক্যানসার কি প্রতিরোধ সম্ভব?

অবশ্যই। সারভিক্যাল ক্যানসার বা জরায়ু-মুখের ক্যানসার, একমাত্র ক্যানসার যার একটি প্রাক্‌ ক্যানসার অবস্থা আছে এবং সেটা আমরা শনাক্ত করতে পারি এবং সেই অবস্থায় চিকিৎসা করতে পারি, যাতে ভবিষ্যতে সেই মহিলার ক্যানসার না হয়। জরায়ু-মুখের ক্যানসার হওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে জরায়ু-মুখে এক ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়, যাকে ডিসপ্লাসিয়া বলে এবং সেটি হয় হিউম্যান পাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে। সেই অবস্থা যদি আমরা শনাক্ত করতে পারি তাহলে খুব সহজ চিকিৎসাতে তা নির্মূল করা যায়। এই ক্যানসার পূর্ববর্তী বা প্রাক্‌ ক্যানসার অবস্থায় চিকিৎসা করলে ভবিষ্যতে ক্যানসার হবার থেকে বেঁচে যাবেন।

প্রাক ক্যানসার অবস্থা কীভাবে শনাক্ত করা যায়?

প্রাক ক্যান্সার অবস্থায় কোনও উপসর্গ থাকে না, সেজন্য যৌন সংসর্গ শুরু করছেন এমন মহিলাদের ২৫ বছরের পর থেকে প্রতি তিন বছরে একবার করে একটি পরীক্ষা করানো উচিত। একে বলে সারভিক্যাল স্ক্রিনিং টেস্ট। যার সাহায্যে জানা যায়, কোনও মহিলার ভবিষ্যতে জরায়ু-মুখের ক্যানসার হবার ঝুঁকি আছে বা নেই।

জরায়ু মুখের ক্যানসার নির্ণয় কয়েকভাবে করা যায়, সেগুলি হলো, (১) প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট (২) লিকিউড বেসড্‌ সাইটোলজি (এল বি সি), (৩) হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস পরীক্ষা, (৪) ভি আই এ ভিসুয়াল ইনস্পেকশন অ্যাসিটিক অ্যাসিড দ্বারা।

প্যাপ স্মেলার বা এল বি সি পরীক্ষায় জরায়ু-মুখ থেকে কিছু কোষ সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং আমরা জানতে পারি জরায়ু-মুখের কোষগুলিতে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি না। জরায়ু থেকে ওই কোষগুলি সংগ্রহ করে আমরা এইচ পি ভি পরীক্ষাও করতে পা‍‌রি। অর্থাৎ ক্ষতিকারক এইচ পি ভি জরায়ু-মুখে আছে কিনা সেটা জানতে পারি। ভি আই এ-তে জরায়ু-মুখে অ্যাসিটিক অ্যাসিড বা ভিনিগার লাগিয়ে দেওয়া হয়। খালি চোখে জরায়ু- মুখের রঙ হালকা গোলাপি কিন্তু সেখানে যদি কোনও কোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়ে থাকে তাহলে অ্যাসিটিক অ্যাসিড সেই অংশে লাগালে তার রঙ হয়ে যায় সাদা। একে সাদা পরিবর্তন বলে। ফলে আমরা বুঝতে পারি, সেখানে অস্বাভাবিক কোষ আছে।

এই সবক’টি স্ক্রিনিং টেস্টে আউটডোর পদ্ধতি। এরজন্য কোনও অজ্ঞান করার দরকার নেই। কোনও ব্যথা লাগে না বা অপারেশন থিয়েটারের কোনও প্রয়োজন নেই। স্ক্রিনিং টেস্টের সব থেকে উপকারী দিক হলো যদি স্ক্রিনিং টেস্ট পজিটিভ হয় অর্থাৎ যদি জরায়ু-মুখের কোষগুলোতে কোনও পরিবর্তন দেখি, তার মানে কিন্তু এই নয় যে, সেই মহিলার ক্যানসার হয়েছে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি যে, সেই মহিলার ভবিষ্যতে ক্যানসার হবার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই স্ক্রিনিং টেস্ট পজিটিভ হলে একটি বিশেষ পরীক্ষা করা দরকার যার নাম কলপোসকপি।

কলপোসপিতে সারভিক্সের কোষগুলোকে ভিডিও স্ক্রিনে আরও বড় করে দেখতে পারি আর এক্ষেত্রেও অ্যাসিটিক অ্যাসিড জরায়ু-মুখে লাগানো হয়। যদি কোনও সাদা ছোপ দেখা যায়, তাহলে ওই জায়গা থেকে ছোট একটু মাংসের টুকরো কে‍‌টে বায়োপসির জন্য পাঠানো যায়। এবং নিশ্চিতভাবে জানা যায়, প্রাক্‌ ক্যানসার বা ক্যানসার আছে কিনা। জরায়ু মুখে কোনও সাড় থাকে না তাই বায়োপসি নিলে ব্যথা লাগে না। বায়োপসির পরে ২-৩দিন কয়েক ফোঁটা রক্ত আসতে পারে, তাই বায়োপসির পরে কয়েকদিন সহবাস বন্ধ রাখা দরকার। অনেকের মনে অহেতুক ভীতি আছে যে, বায়োপসি নিলে রোগ বেড়ে যায় বা ছড়িয়ে যায়। এই ধারণা একেবারে ভিত্তিহীন।

প্রাক্‌ ক্যানসার অবস্থা বা ডিসপ্লাসিয়া যদি ধরা পড়ে, তখন কোলোপসকপির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি সেই কোষের পরিবর্তন কতটা বেশি হয়েছে, এই অবস্থাকে বলা হয় সিআইএন এবং তার বিভিন্ন ধাপ আছে।

সিআইএন-১ -এ জরায়ু মুখের কোষের স্তরের তিনভাগের এক ভাগে পরিবর্তন হয়েছে আর সিআইএন-৩ এ কোষের পুরো স্তর এই পরিবর্তন হয়ে গেছে। তাই সিআইএন-৩ থেকে ক্যানসার হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এজন্য একে হাই গ্রেডসিআইএন বলে। তবে সব থেকে ভালো জিনিস এই যে সিআইএন কিন্তু ক্যানসার নয়। এটি প্রাক্‌ ক্যানসার অবস্থা। এর থেকে ক্যানসার হতে ৭-১০ বছর সময় লাগে। হাই গ্রেড সিআইএন শনাক্ত হলে তার চিকিৎসা করা উচিত। তার ফলে সেই মহিলার ভবিষ্যতে ক্যানসার হবার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না।

সিআইএনএর চিকিৎসা কীভাবে করা হয়

কয়েকটি পদ্ধতি আছে, তা নির্ভর করে কতটা জায়গা জুড়ে পরিবর্তন হয়েছে। প্রথমে জরায়ু-মুখে ইঞ্জেকশন দিয়ে সেই জায়গাটা অসাড় করে দেওয়া হয় আর নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা যায়।

(১) ক্রাইও খেরাপি: এই প্রক্রিয়াতে একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে জরায়ু-মুখের সাদা ছোপের ওপর অত্যন্ত ঠান্ডা বরফ লাগিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে এই কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

(২) লিপ বা লিটজ: এই পদ্ধতিতে মেশিনের সাহায্যে একটি ধাতব তারের লুপ গরম করে জরায়ু-মুখের অস্বাভাবিক অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয়, আর সেই অংশ বায়োপসি করার জন্য পাঠানো হয়। ফলে নির্দিষ্ট করে বোঝা যাবে সিআইএন কোন অবস্থায় আছে।

(৩) কোন বায়োপসি : এই পদ্ধতিতেও জরায়ু-মুখের অস্বাভাবিক অংশ কেটে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু এর পরে রক্তপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে।

(৪) লেজার পদ্ধতিতেও এই কাজ করা যায় যদিও এটি ব্যয় সাপেক্ষ

সারা পৃথিবীতে তাই লিপ বা লিটজ প্রধানত বেশি জনপ্রিয়। এটিও আউটডোর পদ্ধতি। কোনও ব্যথা লাগে না। অজ্ঞান করতে হয় না। পদ্ধতিটি একটু পরে রোগী বাড়ি চলে যেতে পারে। এর পরে ২-৩ সপ্তাহ জলের মতো সাদা স্রাব হতে পারে। অল্প রক্তও আসতে পারে কিছুদিন। যা ধীরে ধীরে আপনা আপনি কমে যায়। তাই এর পরে ৩-৪ সপ্তাহ সহবাস বন্ধ রাখা উচিত। সেই সঙ্গে পুকুরে বা সুইমিং পুলে গোসল করা নিষিদ্ধ। তবে দৈনন্দিন কাজের কোনও বাধা নেই। এই পদ্ধতির ৬মাস বাদে আবার স্ক্রিনিং করে দেখা হয় কোনও ডিসপ্লাসিয়া রয়ে গেলো কিনা।

স্ক্রিনিংয়ের উপকারিতা
ইউরোপের নানা দেশ বিশেষ করে ইংল্যান্ড-এ দেখা গেছে সারভিক্যাল স্ক্রিনিংয়ের ফলে গত ২৫বছরে জরায়ু-মুখের ক্যানসারের হার এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। এই কারণে মৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ৬০শতাংশ। আমেরিকাতে গত ৫০ বছরে জরায়ু-মুখের ক্যানসারে মৃত্যুর হার কমেছে ৭৫শতাংশ।

সারভিক্যাল স্ক্রিনিং কাদের করার প্রয়োজন নেই?
যাদের জরায়ু অপারেশন করে বাদ দেওয়া হয়েছে। যাদের জরায়ু-মুখের ক্যানসার আগে ধরা পড়েছে এবং এর চিকিৎসা হয়েছে। গর্ভবতী অবস্থায় এই পরীক্ষা সাধারণভাবে করা হয় না। সন্তান প্রসবের ৩মাস পর করানো হয়। পিরিয়ড চলাকালীন এই পরীক্ষা করা হয় না। ২৫-৫০ বছরের সকল মহিলা, যাদের যৌন সংসর্গ হয়েছে তাদের প্রতি তিন বছরে অন্তত ১বার জরায়ু-মুখের স্ক্রিনিং পরীক্ষা অবশ্যই করানো উচিত।

এইচ পি ভি (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) :

জরায়ু-মুখের ক্যানসারের কারণ এইচ পি ভি সংক্রমণ। এই ভাইরাসের ১০০-র বেশি বিভিন্ন ভেদ আছে। তবে সবগুলোই ক্যানসারের কারণ নয়। কিছুপ্রকার ভেদ আছে, যার মধ্যে এইচ পি ভি টাইপ ১৬ আর এইচ পি ভি টাইপ ১৮ প্রায় ৭৫শতাংশ জরায়ু-মুখের ক্যানসারের জন্য দায়ী। এই ভাইরাস ডিসপ্লাসিয়া এবং সি আই এন-র জন্যও দায়ী। এছাড়া এইচ পি ভি যৌনাঙ্গে ছোট আঁচিলের মতো রোগ সৃষ্টি করে যাকে বলে জেনিটাল ওয়ার্টস। এই ভাইরাস আক্রান্ত কারুর সাথে যৌনমিলনে অন্যজনের যৌনাঙ্গে এই ভাইরাস ছড়ায়।

জরায়ুমুখের ক্যানসার ধরা পড়লে কী করা উচিত?

সঠিক অবস্থায় সঠিক চিকিৎসা করলে সেরে যায়। বায়োপসি দ্বারা ক্যানসার নির্ণয় হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যানসার হাসপাতালে যাওয়া উচিত। চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যানসার কোন্‌ স্টেজে আছে তার ওপর। যদি প্রাথমিক অবস্থায় থাকে তাহলে অপারেশন করা হয়। আর যদি অ্যাডভান্স স্টেজে থাকে তাহলে রেডিয়েশন বা কেমো রেডিয়েশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।

অনেক সরকারি বা প্রাইভেট হাসপাতালে এই চিকিৎসার সুব্যবস্থা আছে।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *