টনসিলের সমস্যা ও করণীয় নিযে বিভিন্ন প্রশ্নউত্তর

শীতে টনসিলের সমস্যা প্রকটভাবে দেখা যায়। এর অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে জটিলতা বৃদ্ধি পায়। সাধারণত চার থেকে দশ বছর বয়সী শিশুরা টনসিলে বেশি আক্রান্ত হয়।

টনসিলের রোগ বলতে কি বুঝায়? টনসিল কেন হয়?
টনসিল সাধারণত গলার দুপাশে থাকে। এটা এক ধরনের লিম্ফয়েড টিস্যু। এই টিস্যু শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়ায় বা প্রটেকশন দেয়। অর্থাৎ টনসিল রোগ প্রতিরোধ করে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে টনসিলে ইনফেকশন বেশি হয়। টনসিলের ইনফেকশন যখন হয় তখন এটাকে টনসিলাইটিস বলে থাকি।

টনসিলাইটিস বা টনসিল ইনফেকশন কয় ধরনের?
টনসিলাইটিস সাধারণত দুই ধরনের হয়। একটা হলো তীব্র বা একিউট। আর অন্যটি হলো দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক টনসিলাইটিস।

তীব্র টনসিলাইটিসে কি কি উপসর্গ হতে পারে?

তীব্র বা একিউট টনসিলাইটিস যদি কারো হয়ে থাকে তাহলে তার তীব্র গলা ব্যথা হবে, খেতে পারবে না, খেতে গেলে অনেক ব্যথা হবে, জ্বর হবে, মাথা ব্যথা হবে। এমনকি তাকে অসুস্থ রোগীর মতো শুয়ে থাকতে হবে। স্কুলগামী ছেলেমেয়ে স্কুলে যেতে পারবে না। বড়দের ক্ষেত্রে তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে।

তীব্র বা একিউট টনসিলাইটিস থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায় কি?

তীব্র বা একিউট টনসিলাইটিস সাধারণত পানি থেকে হয়। পানি থেকে ব্যাকটেরিয়া এবং খুব ঠাণ্ডা থেকে হয়। ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি খেলে, আইসক্রিম খেলে, খুব বেশি ঠাণ্ডা লাগালে এটি হয়। এছাড়া ভাইরাসজনিত কারণেও হয়। টনসিলের ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া মূলত দায়ী। তাই যে সকল ব্যাকটেরিয়ার কথা বলেছি, সেই ব্যাকটেরিয়া থেকে যদি দূরে থাকা যায় তাহলে টনসিলাইটিস হবে না। আর কিন্তু এগুলোতে যদি ইম্পোজড হয়ে যাই, তাহলে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সবারই যে হয় তা কিন্তু নয়। দেখা যায়, প্রতি ৪ জন শিশুর মধ্যে ১ জনের টনসিলের ইনফেকশন হতে পারে।

তীব্র টনসিলাইটিসের চিকিৎসা কি?

তীব্র টনসিলাইটিসের চিকিৎসা দুই রকমের। একটি হলো মেডিকেল অর্থাৎ সাধারণ। আর অন্যটি হচ্ছে ওষুধপত্র দিয়ে। মেডিকেল অর্থাৎ সাধারণ চিকিৎসায় প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে স্কুলে যাওয়া যাবে না। বড়দের ক্ষেত্রে অফিসে বা দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারবে না। পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে যতদিন সুস্থ না হবে। মুখের হাইজিন (মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য) বা ওরাল হাইজিন যেটাকে বলি। ওটা মেইনটেন করতে হবে। এটা আমরা মাউথ ওয়াশ বলি। মাউথ ওয়াশ দিয়ে কুলি করতে হবে। নরমাল স্যালাইন (ওয়াটার গার্গেল) গরম পানি দিয়ে গড়গড়া কুলি করা। আজকাল বাজারে পাওয়া যায় ওরোক্লিন। ওরোক্লিন দিয়ে গড়গড়া কুলি করতে পারেন। তাহলে হাইজিনটা মেইনটেন হবে। ওষুধের চিকিৎসায় যেহেতু তীব্র ব্যথা থাকে এবং জ্বর থাকে তাই আমরা প্যারাসিটামল বা রিসেট জাতীয় ওষুধ দেই। বাচ্চাদের বেলায় সিরাপ, বয়স্কদের বেলায় ট্যাবলেট ৫০০ মি. গ্রা. ১টা করে তিনবার যতদিন জ্বর থাকে ততদিন ভরাপেটে খেতে হবে। এটা যেহেতু ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন। এই ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশনের জন্য এন্টিবায়োটিক খেতে হবে। এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিন খুব ভালো কাজ করে। এমপিসিলিন আজকাল সেফাকুইন, বাজারে পাওয়া যায় এগুলো ভালো ওষুধ। যেমন সেফিক্সিম যেটা মিকচার হিসেবে বাজারে পাওয়া যায়। এমোক্সিসিলিন, সিফিউরোক্সাইম বাজারের কিলব্যাক ৫০০ মি. গ্রা. ২ বার করে ৭ থেকে ১০ দিন অথবা সিকিউরোক্সাইম মিকচার হিসেবে পাওয়া যায় এটা ২০০ মি. গ্রা. করে ২ বার বা ৪০০ মি. গ্রা. দিনে ১ বার করে খেতে হবে। এই ওষুধ ৮ থেকে ১০ দিন খেলে ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যায় এবং রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। এটাই হলো আসল চিকিৎসা। পরবর্তীতে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

একজন রোগীর একবার হলে এটি কি আবার হতে পারে?

হ্যাঁ অবশ্যই। আবার হতে পারে যদি সে একই ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এক্সপোজড হয়।

এরকম অবস্থায় কি করণীয়?

এখন আমরা দেখব রোগীর যদি বছরে ৫ বারের বেশি টনসিল ইনফেকশন হয়। এভাবে যদি পর পর দুই বার হয় তাহলে টনসিল অপারেশন করাই ভালো। কারণ তখন আর এন্টিবায়োটিক কাজ করবে না।

কি কি কারণে টনসিলের অপারেশন করা দরকার?
ক্রনিক টনসিলাইটিসের কারণ ছাড়াও আরো অনেক কারণে টনিসল অপারেশন করা দরকার। যেমন অনেক ছোট বাচ্চার টনসিলগুলো বড় হয়ে গেছে। টনসিল বড় হয়ে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হয়। তখন তার ব্রেনে অক্সিজেন কম হয়। সে পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে যায়। সেসব ক্ষেত্রে টনসিল অপারেশন করে ফেলে দেয়া উচিত। টনসিল অপারেশন না করলে রাতে বাচ্চা মুখ হা করে ঘুমায়, নাক ডাকে এবং অনেক অসুবিধা হয়। টনসিলে যদি ফোঁড়া হয়, অর্থাৎ ইনফেকশন হলো ঠিকমতো চিকিৎসা করল না, অবহেলা করল; এই অবহেলার কারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন টনসিল ইনফেকশন থেকে রিউম্যাটিক ফিভার হয়, পরবর্তী বয়সে কিডনি ফেইল হতে পারে। এছাড়া এতে করে রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ হয়ে যেতে পারে। এসব কারণ ছাড়াও যদি ক্রনিক ক্রিপটোক কঙ্কাল ইনফেকশন থাকে তাহলে দেখবেন টনসিল ছোট কিন্তু তার ব্যথা নেই। ইনফেকশন হলে অল্প ব্যথা হয়। তাহলে ওই টনিসল ফেলে দেয়া উচিত। এ ছাড়াও দেখা যায় হঠাৎ টনসিল বড় হয়ে গেল। নরমাল টনসিলটি হঠাৎ দেখা গেল এক পাশে বড় হয়ে গেল। দেখতে হবে ওই টনসিলে ক্যান্সার কিংবা বা টিউমার কিনা। যদি মনে করা হয় এতে ক্যান্সার বা টিউমার আছে; তখন ওই টনসিলটা ফেলে দিতে হয়।

কি কি উপায়ে টনসিল অপারেশন করা হয়?

আমাদের দেশে টনসিলের অপারেশন করার অনেক উপায় আছে। যেমন ডিটেকশন মেথড যেটা সারা বিশ্বব্যাপী হয়। আর একটা আজকাল লেজার দিয়ে করা হয়। আল্ট্রা সাউন্ড অ্যান্ড হারমোনিক স্কালপেল দিয়ে করা যায়। যেটা আমি করি আমার প্রাইভেট ক্লিনিকে। এটা হলো রক্তপাতহীন এবং সময় খুব কম লাগে। কোনো সেলাই লাগে না। তারপর ইলেকট্রো কটারি আছে। এগুলো আমাদের দেশে নেই। এগুলোর জন্য শিক্ষিত জনবল এবং ওই যন্ত্রপাতির সেটআপ লাগে। কিন্তু আল্ট্রা সাউন্ডটা আমি বাংলাদেশে করি। বাংলাদেশে লেজার টনসিল অপারেশন করা হয়। আর ডিটেকশনটা জনপ্রিয় এবং সব জায়গায় সবাই করতে পারে।

কখন টনসিল অপারেশন করা যাবে না। বা দরকার পড়ে না?

যেমন একিউট ইনফেকশন যদি হয়। একিউট ইনফেকশন থাকলে টনসিল অপারেশন করা যাবে না। কারণ তখন ইনফেকশন সারা শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং রক্তপাত বন্ধ নাও হতে পারে। সেজন্য ওই সময়ে করা যাবে না। জ্বর বা ব্যথা থাকা অবস্থায় করা যাবে না। যদি কারো রক্তরোগ থাকে যেমন থ্যালাসেমিয়া। রক্তনালী এবং রক্তরোগ থাকলে টনসিল অপারেশন করা যাবে না। কারণ দেখা গেল তার রক্তরোগ আছে, অপারেশনের পর তার রক্তপাত বন্ধ হচ্ছে না। সেজন্য এটা আগে থেকে স্ক্রিনিং করে নিতে হবে যে, তার রক্তরোগ আছে কিনা। এছাড়া হাই ব্লাডপ্রেসার থাকলে করা যাবে না। এক্ষেত্রে যদি করতেই হয় তাকে ব্লাড প্রেসার কন্ট্রোল করে অপারেশন করতে হবে। এটা খুব সাবধানে করতে হবে। ডায়াবেটিক থাকলেও ডায়াবেটিক কন্ট্রোল করতে হবে, যদি করতেই হয়। তবে এক্ষেত্রে টনসিল অপারেশন না করাই ভালো। অ্যাজমা বা হাঁপানি যদি থাকে সে ক্ষেত্রেও টনসিলে অপারেশন না করা ভালো। টনসিলের অপারেশন করতে অ্যানেসথেসিয়া অর্থাৎ পুরো শরীর অবশ করতে হয়। অ্যাজমার ক্ষেত্রে খুব সাবধানতার সঙ্গে অজ্ঞান করতে হয়। সেজন্য যতটুকু সম্ভব না করাই ভালো। আর অনেক সময় বয়স্ক রোগীদের অর্থাৎ ৪০ বছর পরে তাদের সাধারণত টনসিলের অপারেশন আর লাগে না। যদি থাকে তাহলে দেখেশুনে সাবধানে করতে হয়।

টনসিলের অপারেশন করলে কোনো সমস্যা হয় কিনা?

আমি বলব হয় না। আজকাল এটা খুবই সেফ অপারেশন। আলট্রাসনিক এটা খুবই উন্নত, সময় খুবই কম লাগে। কোনো রক্তপাত হয় না। কোনো সেলাই লাগে না। অপারেশনের পর পরই রোগী আইসক্রিম খেতে পারে। সকালে করে রোগী বিকেলে বাসায় চলে যেতে পারে।

এই অপারেশনের খরচ কেমন পড়ে?
এটার খরচ খুব বেশি পড়ে না। তবে গরিব কিংবা আর্থিক অসুবিধা থাকলে ওটা আমরা বিবেচনা করি। যদি ডিটেকশন মেথডে করা হয় তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রক্তপাতের সম্ভাবনা থাকে। তবে এটার সম্ভাবনা খুবই কম। এটা ০-১%। অর্থাৎ ১ লাখে ১ জন।

টনসিল শরীরের রোগ প্রতিরোধ করে যেহেতু এই টনসিল ফেলে দিলে পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হতে পারে?
টনসিলের কাজ হচ্ছে শরীরে রোগ প্রতিরোধ করা। শরীরকে পাহারা দেয়া। এখন যদি টনসিল ফেলে দেয়া হয় তাহলে কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। এই কথাটি আসলে ঠিক নয়। কারণ টনসিল হলো প্রথম পাহারাদার। এরপরও গলায় ৩০০-এর বেশি গ্ল্যান্ড আছে। যারা এই কাজ করে। দুটো টনসিল ফেলে দিলে বাকি ৩০০-এর বেশি গ্ল্যান্ড থেকে যাচ্ছে। যারা রোগ প্রতিরোধ করে। অনেক স্টাডি করে দেখা গেছে, টনসিল অপারেশন করার আগে ও পরে রোগ প্রতিরোধে কোনো তারতম্য হয় না। ধরেন ১ ঝুড়ি আম রয়েছে। সেই ঝুড়িতে ১টি আমে পচন ধরলে বাকি আমেও পচন ধরবে। তাই পচা আমটি ফেলে দিলে অন্য আমগুলো ভালো থাকবে। টনসিলের ক্ষেত্রে তেমনই। ওই টনসিল শরীরের বিভিন্ন ক্ষতি করবে।

একবার টনসিল অপারেশন করলে পরবর্তীতে টনসিল দেখা দিতে পারে কিনা?

এটি খুবই ভালো প্রশ্ন। অনেকেই এই প্রশ্নটি করে যে আবার হয়। টনসিল তো আমি ফেলেই দিলাম। তাহলে টনসিলাইটিস হবে কোথা থেকে। টনসিল তো নাই ওর শরীরে। এখানে একটা ভুল ধারণা আছে যেটা হয় সেটা হলো ঠাণ্ডা লাগা। যখন ঠাণ্ডা লাগে একটু ব্যথা করে। অনেকের ভুল ধারণা টনসিল অপারেশন করলাম আবার কেন গলা ব্যথা হলো। আসলে এটা অন্য রোগ। রোগী ঠাণ্ডা কিংবা এলার্জিজনিত রোগে ভুগছেন। ঠাণ্ডা লাগলে রোগীকে সাবধানে থাকতে হবে যেন ঠাণ্ডা না লাগে। এলার্জি থেকে দূরে থাকতে হবে। তাহলে তার গলা ব্যথা হবে না।

প্রফেসর ডা. এম আলমগীর চৌধুরী
এমবিবিএস, ডিএলও, এমএস (ইএনটি), এফআইসিএস
গোল্ড মেডালিস্ট (ইউএসএ)
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান নাক, কান ও গলা বিভাগ
মেডিকেল কলেজ ফর উইমেন এন্ড হসপিটাল, উত্তরা, ঢাকা।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *