তিসিবীজের অসাধারন কিছু গুনাগুন জেনেনিন

প্রায় ৬ হাজার বছর ধরে তিসিবীজ বা ফ্ল্যাক্স সিড খাবার হিসেবে গ্রহণ করা হয়ে আসছে এবং এটিই সম্ভবত বিশ্বে চাষ করা সবচেয়ে পুরনো এবং প্রথম সুপার ফুড। এই তিসিবীজের উপকারিতা হচ্ছে তা ভালো হজমে সাহায্য করে, ত্বক সুন্দর করে, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, চিনি খাবার ইচ্ছাকে কমায়, হরমোনের ভারসাম্যতা রক্ষা করে, ওজন কমাতে সাহায্য করে, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়ে। এছাড়াও এমন আরো অনেক উপকারিতা রয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণত বাদামি ও হলুদ রঙের তিসি বীজ বেশি পাওয়া যায়। এটি উদ্ভিদ উৎস থেকে প্রাপ্ত ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎস যা আলফা লিনোলেইক এসিড (ALA) হিসেবে পরিচিত।

তিসিবীজের পুষ্টিগুন:
তিসিবীজের অনেক ধরনের পুষ্টি উপকারিতা রয়েছে। ১০০ গ্রাম তিসিবীজে রয়েছে:

  • ক্যালরি: ৫৩৪ কিলোক্যালরি
  • শর্করা: ২৮.৮৮ গ্রাম
  • প্রোটিন: ১৮.২৯ গ্রাম,
  • ফ্যাট: ২৭.৩ গ্রাম,
  • খাদ্য আঁশ: ৮ গ্রাম
  • থায়ামিন: ১.৬৪ মিলিগ্রাম
  • রাইবোফ্লাভিন: ০.১৬১ মিলিগ্রাম
  • ম্যাগনেশিয়াম: ৩৯২ মিলিগ্রাম
  • ফোলেট: ৬ মাইক্রোগ্রাম
  • ফসফরাস: ৬৪২ মিলিগ্রাম
  • পটাশিয়াম: ৮১৩ মিলিগ্রাম
  • জিংক: ৪.৩৪ মিলিগ্রাম
  • ম্যাংগানিজ: ০.১৭৪ মিলিগ্রাম

উপরোক্ত পুষ্টি উপাদানের পরিমান গুলো দেখেই বোঝা যায় যে তিসিবীজ কতটুকু পুষ্টিসম্পন্ন খাবার।

তিসিবীজের উপকারিতা:

  • তিসি বীজ উচ্চমাত্রার আঁশ এবং কম শর্করাযুক্ত: তিসিবীজে একধরনের জেলির মত খাদ্য আঁশ থাকে যা পানিতে দ্রবণীয় তাই এটি আভ্যন্তরীণ অঙ্গের জন্য অবিশ্বাস্য রকমের উপকারী। যা পাকস্থলীকে দ্রুত খালি করতে সাহায্য করে যার ফলে পুষ্টি উপাদান দেহে ভালো ভাবে শোষিত হতে পারে। তিসিবীজে দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় দুই ধরনের আঁশ থাকায় তা কোলনের বিষাক্ততা দূর করতে সাহায্য করে, ওজন কমাতে এবং চিনি খাবার ইচ্ছাকে কমাতে সাহায্য করে।
  • সুন্দর ত্বক ও চুলের জন্য: স্বাস্থ্যবান ত্বক, চুল ও নখ পেতে প্রতিদিনের পানীয়তে ২ টেবিল চামচ তিসিবীজ রাখুন বা ১ টেবিল চামচ তিসির তেল রাখুন প্রতিদিনের খাওয়াতে।তিসিবীজে থাকা ALA ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাট সরবরাহ করে যা ত্বকের রুক্ষতা ও শুষ্কতা দূর করতে সাহায্য করে। ত্বকের অ্যাকজিমা, ব্রনের সমস্যা দূর করে এটি। নিয়মিত এটি খেলে ত্বক এবং চুল আভ্যন্তরীণ ভাবে স্বাস্থ্যবান হয়।
  • ওজন কমাতে: তিসিবীজে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও আঁশ আপনাকে অনেক্ষন পেট ভরা থাকার অনুভূতি দেয় যার ফলে কম ক্যালরি গ্রহণ করা হয় এবং ওজন কমে। ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডের ALA অর্থাৎ আলফা লিনোলেইক এসিড শরীরের উদ্দীপ্ততা কমাতে সাহায্য করে। উদ্দীপ্ত শরীরের সব সময় প্রবণতা থাকে অতিরিক্ত ওজন ধরে রাখার। তাই ওজন কমাতে প্রতিদিনের খাবার তালিকায় স্যুপ, সালাদ ও যেকোনো পানীয়ের সাথে কয়েক চা চামচ তিসিবীজ রাখুন।
  • কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে: তিসিবীজ প্রাকৃতিক ভাবে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। তিসিবীজের দ্রবণীয় আঁশ চর্বি ও কোলেস্টেরলকে হজমতন্ত্রের মাঝে এমন ভাবে আঁটকে ফেলে যে আর দেহে শোষিত হতে পারে না।
  • গ্লুটেন ফ্রি: তিসিবীজ গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার গুলোর চমৎকার বিকল্প হতে পারে। কারন গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার গুলো প্রদাহী অপরদিকে তিসি হচ্ছে প্রদাহবিরোধী। তাই যাদের সিলিয়াক ডিজিজ বা গ্লুটেন অ্যালার্জি রয়েছে তাদের জন্য তিসিবীজ হতে পারে চমৎকার একটি খাবার। আবার যাদের সামুদ্রিক মাছের ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডে অ্যালার্জি রয়েছে তাদের জন্য ও চমৎকার বিকল্প হতে পারে।
  • তিসিবীজ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ: তিসিবীজ অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে পরিপূর্ণ। যা অ্যান্টিঅ্যাজিং, হরমোনের ভারসাম্যতা এবং কোষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুবই উপকারী।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে: তিসিবীজ রক্তের শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে যার ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।
  • হজমক্রিয়াকে উন্নত করে: তিসিবীজের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হচ্ছে হজমক্রিয়াকে উন্নত করে। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে প্রাকৃতিকভাবে মুক্তি পেতে ১-৩ টেবিল চামচ তিসির তেল ২৫০ মিলি বা ১ কাপ গাজরের জুসের সাথে নিয়মিত গ্রহণ করলে উপকার পাওয়া যায়। এটি সর্বোচ্চ ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধও খাবার। এতে থাকে দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় খাদ্য আঁশ হজম ক্রিয়াকে উন্নত করে। ২ টেবিল চামচ তিসিবীজে রয়েছে প্রায় ৫ গ্রাম আঁশ যা আমাদের RDA বা প্রতিদিনের চাহিদার ১/৪ অংশ। তিসিবীজের আঁশ কোলনকে পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
  • ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে: তিসিবীজ স্তন, প্রোস্টেট, ওভারিয়ান এবং কোলন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। তিসিবীজে থাকা ৩ ধরনের lignan দেহে থাকা হরমোনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যতা বজায় রাখে যা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া এই lignan এন্ডমেট্রিয়াল ও ওভারিয়ান ক্যান্সার ও প্রতিরোধ করে।
  • উচ্চ মাত্রার ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ: আমরা ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডের উপকারিতার কথা কম বেশি সবাই জানি। মাছ থেকে প্রাপ্ত ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডে eicosapentaenoic acid (EPA)এবং docosahexaenoic acid (DHA) থাকে আর তিসিবীজের ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডে থাকে আলফা লিনোলেইক এসিড(ALA) যা আমাদের দেহে সহজে কাজ করতে পারে। এই ALA হচ্ছে একটি স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যা আমাদের প্রতিদিনের সুষম খাবারের তালিকায় রাখা উচিত।

কোথায় পাওয়া যায়:
যদিও তিসিবীজ আমাদের দেশেও চাষ হয় কিন্তু অন্যান্য শস্যের মত এতো পরিচিত নয়। তিসি সাধারণত অর্গানিক খাবার যেসব দোকানে পাওয়া যায় সেখানে পাবেন। এছাড়া মশলার দোকানে বা বীজ যেসব দোকানে বিক্রি করে সেখানেও পেতে পারেন। এখন বিভিন্ন অনলাইন গ্রসারি শপে তিসি পাওয়া যায়। আপনারা চাইলে অনলাইনে অর্ডার করেও কিনতে পারবেন।

লেখক: জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ, জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ; এক্স ডায়েটিশিয়ান,পারসোনা হেল্‌থ; খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান (স্নাতকোত্তর) (এমপিএইচ) ; মেলাক্কা সিটি, মালয়েশিয়া।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...

One thought on “তিসিবীজের অসাধারন কিছু গুনাগুন জেনেনিন

  • June 8, 2016 at 7:59 am
    Permalink

    অসাধারন লেখ পড়লাম

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *