মানসিক রোগ লজ্জা নয়- সঠিক চিকিৎসায় পেতে পারে নতুন জীবন-মো: সানাউল হক

দেশের মাদকাসক্ত ও মানসিক চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নিউ মুক্তি ক্লিনিকের নির্বাহী পরিচালক। প্রবীন ও অভিজ্ঞ এই ব্যক্তি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে মাদকাসক্তি ও মানসিক সমস্যা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তার ক্লিনিকে বসে কথা হয় দেশের মানসিক সমস্যার বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে। সাক্ষাৎকার গ্রহন :. মো: রবিউল ইসলাম

শেয়ারবিজ : মানসিক রোগ কী?
মো: সানাউল হক : মানসিক রোগ হল, একজন ব্যক্তির সুস্থভাবে চিন্তা করতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সঠিকভাবে আচরণ করতে না পারা। এই অবস্থা প্রায়ই একজন ব্যক্তির অন্যদের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার এবং জীবনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে মোকাবিলা করার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। খেয়াল করলে দেখবেন একজন ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে কথা বলছে আর বলছে আবার যখন কথাবলা দরকার তখন চুপ করে আছে অনুরূপভাবে যখন হাসির উপসর্গ আসে তখন সে হেসে কাঁদছে এরকম অসঙ্গতি যখন কোন ব্যক্তির মধ্যে দেখা যায় তখন বুঝতে হবে সে মানসিক রোগে আক্রান্ত।
ব্যক্তি-বিশেষ এবং অসুস্থতা ও পরিস্থিতির ওপর নিভর্র করে রোগের লক্ষণ হয়তো ভিন্ন হতে পারে। লিঙ্গ, বয়স, সংস্কৃতি, জাতি, ধর্ম অথবা শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলেই এতে আক্রান্তহ হতে পারে। মানসিক রোগ কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা অথবা চারিত্রিক ত্রুটির ফল নয়। উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যক্তি-বিশেষদের চিকিৎসা সম্ভব এবং তারা এক ফলপ্রসূ ও আনন্দময় জীবন কাটাতে পারে।

শেয়ারবিজ : কোন ধরনের লোক সাধারনত মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়?
মো: সানাউল হক : বাংলাদেশে যারা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন তাদের একটি অংশ আক্রান্ত হন বায়োলজিক্যাল এবং জেনেটিক কারণে। কিন্তু বড় একটি অংশ আক্রান্ত হন পারিবারিক এবং সামাজিক কারণে। নানা চাপ, দারিদ্র্য, সামাজিক এবং পারিবারিক অসঙ্গতিও এর অন্যতম একটি কারণ। ‘পারিবারিক সচেতনতার অভাবেই মানসিক রোগের শুরু হয়। পরিবারে মা-বাবারা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে শিশুদের সামনে ঝগড়া বিবাদ করে। অহেতুক গালাগাল, দোষারোপ, দুর্ব্যবহার করে, যা শিশুদের ছোট মনে ছোট ছোট বিষষœতার জন্ম দেয়, আর শিশুরা বড় হবার সাথে সাথে এই বিষষœতা ধীরে ধীরে মানসিক চাপে পরিণত হয়। এই মানসিক চাপ কেউ সহ্য করতে পারে আর কেউ না পেরে হয়ে যায় রোগী।”

শেয়ারবিজ : আমাদের দেশে কি কি ধরনের মানসিক রোগ দেখা যায়?
মো: সানাউল হক : আমাদের দেশেই নয় সারা পৃথিবিতে প্রায় একই ধরনের মানসিক রোগী দেখা যায়। আর বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগ রয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রধান প্রধান মানসিক রোগের মধ্যে রয়েছে সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসওর্ডার, বিষষœতা, দুঃশ্চিন্তা, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসওর্ডার, বিভিন্ন ধরনের ফোবিয়া, সামাজিক ভীতি, প্যানিক ডিসওর্ডার, ডিসোসিয়েটিভ ডিসওর্ডার, কনভার্সন ডিসওর্ডার, হাইপোকন্ড্রিয়াসিস, পারসোনালিটি ডিসওর্ডার, ইমসোমনিয়া (ঘুমের সমস্যা), মাদকাসক্তি, সাইকোসেক্সুয়াল ডিসওর্ডার ইত্যাদি।
মানসিক রোগ ছাড়াও আরো কিছু কারণে মানসিক চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিতে হয়। যেমন : সম্পর্কগত সমস্যা (দাম্পত্য, সন্তান-পিতামাতা, সহদর), নির্যাতনের (মানসিক, শারীরিক ও যৌন) শিকার হলে, শিশু নিগ্রহের শিকার হলে, কোনো ট্রমাটিক ঘটনার মুখোমুখি হলে, কাজে বা পড়াশোনাতে ভালো করতে না পারলে ইত্যাদিসহ এমন সব বিষয় যা ব্যক্তিকে তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে রাখে।

শেয়ারবিজ : মানসিক রোগীর রোগনির্ণয় করেন কিভাবে?
মো: সানাউল হক : মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলি সর্বাধিক পর্যবেক্ষন ও পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে মূল্যায়ন করার পর চিকিৎসকগণ পরামর্শদানের মাধ্যমে প্রথমিক চিকিৎসা করেন। তবে রোগী তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ীর ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক ব্যাধিযুক্ত রোগের লক্ষণ ও সংক্রমণের বিষয়গুলো মূল্যায়ন দ্বারা ব্যক্তিদের একটি চিকিৎসা সেবা প্রদান করে । মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদানকারীরা বা ক্লিনিকাল মনোবৈজ্ঞানিকরা ক্লায়েন্টের অসুবিধা এবং পরিস্থিতিতে ক্লিনিকাল রিপোর্ট তৈরির ভিত্তিতে একই ডায়গনোস্টিক বিভাগগুলি প্রয়োগের মাধ্যমেও চিকিৎসা প্রদান করেন।
মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যে নিয়মিত ডায়গনোস্টিক অনুশীলনের সাথে সাধারণত একটি সাক্ষাতকার জড়িত যা মানসিক অবস্থার পরীক্ষা হিসাবে পরিচিত । যেখানে চেহারা এবং আচরণ, স্ব রিপোর্টেড লক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্যের ইতিহাস, এবং বর্তমান জীবন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে রিপোর্ট তৈরি করা হয়। অন্যান্য পেশাদার, আত্মীয় বা অন্যান্য তৃতীয় পক্ষের মতামত বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে । খারাপ স্বাস্থ্য বা ঔষধ বা অন্যান্য ড্রাগের প্রভাব পরীক্ষা করতে একটি শারীরিক পরীক্ষা পরিচালিত হতে পারে। মনস্তাস্তিক পরীক্ষার মাঝে মাঝে কাগজ ও কলম বা কম্পিউটারাইজড প্রশ্নাবলী ব্যবহার করা হয় । বিরল বিশেষ লক্ষণের ক্ষেত্রে নিউরোইমেজিং পরীক্ষার জন্য অনূর্ধ্ব করা যেতে পারে, তবে এই ধরণের পদ্ধতিগুলি রুটিন ক্লিনিকাল র্প্যাকটিসের তুলনায় গবেষণা কাজে আরও বেশি পাওয়া যায় ।
শেয়ারবিজ : মানসিক রোগের ওষুধ চিকিৎসা পদ্ধতি কি
মো: সানাউল হক : মানসিক রোগের ওষুধ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী অনেকে আবার ওষুধ ছাড়া শুধু সাইকোথেরাপি অথবা কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে দেয়ার দাবি জানান। মানসিক রোগের ধরন অনুযায়ী ওষুধ, সাইকোথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো রোগের জন্য কোনো ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, তার গবেষণাভিত্তিক দিক নির্দেশনা রয়েছে। কিছু রোগের চিকিৎসায় যেমন সাইকোথেরাপিই প্রথম পছন্দ, আবার সিজোফ্রেনিয়া, ম্যানিয়া, তীব্র বিষণœতাসহ আরো কিছু রোগে ওষুধ অপরিহার্য। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রোগীর রোগ নির্ণয় করে তার জন্য কোনো ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, সে পরামর্শ দেবেন। মানসিক সমস্যা হলেই যে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খাওয়া শুরু করতে হবে, সেটা যেমন ঠিক নয়- তেমনি সব মানসিক রোগ ওষুধ ছাড়াই ভালো করা যাবে- তাও সত্য নয়। মানসিক রোগের ওষুধ শুরু করতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে, বন্ধও করতে হবে তার পরামর্শমতো।

শেয়ারবিজ : মানসিক রোগীদের সাইকোথেরাপি কি?
মো: সানাউল হক : মানসিক রোগের জন্য একটি প্রধান চিকিৎসা হল সাইকোথেরাপি। এটি বিভিন্ন ধরনের হয়। জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি (ঈইঞ) ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় যা একটি নির্দিষ্ট ব্যাধির সঙ্গে যুক্ত ধারণা এবং আচরণের নিদর্শন পরিবর্তন করার উপর ভিত্তি করে এই থেরাপি দেয়া হয়। মানসিক দ্বন্দ্ব এবং প্রতিরক্ষার অন্তর্নিহিত মনোবিশ্নেষণ করে যে থেরাপি দেয়া হয় তাকে বলে ডমিন্যান্ট স্কুল অফ সাইকোথেরাপি যা এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে। পদ্ধতিগত থেরাপি বা পারিবারিক থেরাপি কখনও কখনও ব্যবহার করা হয় যেখানে অন্যদের একটি নেটওয়ার্ক এর আওতায় এনে থেরাপি দেয়া হয়।

কিছু সাইকোথেরাপি মানবতামূলক পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে দেয়া হয়। বিশেষ রোগের জন্য কিছু নির্দিষ্ট চিকিৎসা আছে, যা উপ শাখা বা সংকর হতে পারে । মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদাররা প্রায়ই একটি সারগ্রাহী বা সংহত পদ্ধতির প্রয়োগ করেন । অনেক চিকিৎসা চিকিৎসাগত সম্পর্কের উপর নিভর্র করে যেখানে বিশ্বাস, গোপনীয়তা এবং প্রবৃত্তি নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

শেয়ারবিজ : মাদকদ্রব্যের সাথে মানসিক রোগের সম্পর্ক কি?
মো: সানাউল হক : মাদকদ্রব্য ব্যবহারের সাথে মানসিক ব্যাধির সম্পর্কগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেমন- গাঁজা, অ্যালকোহল এবং ক্যাফেইন যা ব্যবহার করলে উদ্বেগ বেড়ে যায় বলে মনে করা হয় । সাইকোসিস এবং সিজোফ্রেনিয়ার জন্য যেসব ওষুধের ব্যবহার করা হয়, যেমন- গাঁজা, কোকেন এবং এমফেটামিন যা মানসিক ব্যাধি বৃদ্ধির কারণের সাথে যুক্ত। গাঁজা ব্যবহার এবং দ্বিপদসংক্রান্ত ব্যাধির মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *