লিভার সিরোসিস কী, এর কারন ও প্রতিকার কি?-সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারুক আহমেদ

লিভার সিরোসিস একটি জটিল রোগ। সাধারণত লিভারের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের কারণে এটি হয়। এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২৩৮৭তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারুক আহমেদ।

প্রশ্ন : লিভার সিরোসিস কি?

উত্তর : যেকোনো কারণে যদি লিভারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ হয়, তাহলে একসময় গিয়ে লিভারের মধ্যে কিছু গুটি তৈরি হয় এবং লিভার তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থাকে লিভার সিরোসিসের সঙ্গে আমরা গণ্য করি।

প্রশ্ন : লিভার সিরোসিসের পেছনে কি কোনো কারণ রয়েছে?

উত্তর : লিভার সিরোসিস হওয়ার পেছনে মূল যে কারণ সেটি হলো ভাইরালজনিত। সাধারণত হেপাটাইটিস বি আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। এ ছাড়া হেপাটাইটিস সি। এই দুটো ভাইরাস দিয়েই সাধারণত লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে। আর এ ছাড়া লিভারের চর্বিজনিত কারণে বা ফ্যাটি লিভার যাদের থাকে, তাদের ক্ষেত্রে যদি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ থাকে, তাহলেও লিভার সিরোসিস হতে পারে। আর মদ্যপানজনিত কারণে হতে পারে। এ ছাড়া জন্মগত কিছু অসুখ আছে, যেমন হেমোক্লোম্যাটোসিস জাতীয় কিছু কিছু অসুখ থেকেও কারো কারো লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে।

প্রশ্ন : বলছিলেন যে দীর্ঘদিন কোনো প্রদাহ থাকলে সেটি থেকে হয়। তাহলে কি বয়স এখানে কোনো কারণ হিসেবে কাজ করে বা কোনো বিশেষ বয়সের ক্ষেত্রে কি এই রোগের প্রভাব বেশি থাকে?

উত্তর : সাধারণত আমাদের দেশে শিশু বয়সটা হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এতে ১০ থেকে ২০ বছর বয়সে অনেকে আক্রান্ত হয় বা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে তারা বেশি আক্রান্ত হয়। আর অন্য যে ভাইরাসটি বললেন হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সেটি সাধারণত কোনো রক্ত পরিসঞ্চালন বা কোনো অস্ত্রোপচার-এই জাতীয় কারণে সমস্যা হয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে মাঝবয়সী লোকজনই বেশি আক্রান্ত হয়। তাদের ক্ষেত্রেও ১০ থেকে ১৫ বছর পরে লিভার সিরোসিস দেখা দেয়।

প্রশ্ন : লিভার সিরোসিসের লক্ষণ বা উপসর্গ কী?

উত্তর : লিভার সিরোসিসের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে লক্ষণ অনেকের ক্ষেত্রে বোঝা যায় না। কোনো লক্ষণ ছাড়াই ধীরে ধীরে লিভারের মধ্যে প্রদাহ হতে থাকে। তবে এটি যদি বেড়ে যায়, তখন দেখা গেছে কারো পেটে পানি চলে আসে বা পায়ে পানি আসতে পারে। তার ক্ষুধামান্দ্য দেখা দিতে পারে। শরীরে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। এই জাতীয় সমস্যা নিয়ে সাধারণত লিভার সিরোসিসের রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসে।

প্রশ্ন : তাহলে কি প্রাথমিক পর্যায়ে বোঝার কোনো সম্ভাবনা নেই?

উত্তর : দুভাবে বোঝা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে লিভার সিরোসিসের রোগীদের ক্ষেত্রে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। অথবা অন্য কোনো কারণে হয়তো সে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়েছে, এই অবস্থায় তার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েও এটি ধরা পড়তে পারে।

প্রশ্ন : আপনাদের কাছে যখন সমস্যা নিয়ে রোগীরা আসেন, তখন কী ধরনের পরামর্শ দেন বা পরীক্ষা করতে বলেন।

উত্তর : আগে তো শারীরিকভাবে তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখি। তখন দেখি যে তার মধ্যে অসুখের লক্ষণ আছে কি না। পাশাপাশি আমরা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখি কী কারণে তার লিভার সিরোসিস হয়েছে। এখানে দুটো বিষয়। একটি হলো তার কারণ দেখা। আরেকটি হলো সিরোসিস রোগের কতটুকু কোন অবস্থায় আছে। সেগুলো দেখার জন্য আমরা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। এর মধ্যে কিছু রক্তের পরীক্ষা করা হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম, এন্ডোস্কোপি করা হয়। এগুলো করে আমরা তার অসুখের মাত্রা নির্ণয় করি। কারণটিও খুঁজে নিই। কারণের ওপর নির্ভর করছে চিকিৎসাটি। চিকিৎসা দুই ধরনের। কারণ নির্ণয় করতে পারলে সেটার চিকিৎসা করা হবে। পাশাপাশি লক্ষণ যে প্রকাশ পাচ্ছে বা সিরোসিসের যে জটিলতা হচ্ছে, সেই জটিলতাগুলো কমানোর জন্যও কিছু কিছু চিকিৎসা করা হয়।

প্রশ্ন : লিভারের সমস্যা থেকে দূরে থাকতে প্রতিরোধের কী কী বিষয় রয়েছে।

উত্তর : লিভার সিরোসিসের কয়েকটি কারণ আছে, এগুলো থেকে নিবৃত থাকতে হবে। হেপাটাইটিস বিয়ের আগে স্ক্রিনিং করার উপায় আছে এবং এর টিকাও আছে। এর মাধ্যমে এর থেকে মুক্ত থাকা যায়। আর হেপাটাইটিস সি টেস্ট করা যায়, হেপাটাইটিস সির সমস্যা আছে, তার কোনো টিকা নেই তবে প্রয়োজনে চিকিৎসা করা যায়।

আর এ ছাড়া অন্যান্য যে বিষয়গুলো রয়েছে যে অ্যালকোহল থেকে অবশ্যই নিবৃত থাকতে হবে। কারণ, অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানের কারণে লিভার সিরোসিস রোগ হয়। আর যাদের ফ্যাটি লিভারজনিত সমস্যা আছে, তাদেরও চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হবে। এ ছাড়া খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে আর অন্য কোনো পরামর্শ নেই। অন্য যাঁরা খান তাঁদের জন্য একই পরামর্শ।

প্রশ্ন : এই জাতীয় সমস্যা নিয়ে যাঁরা আছেন, তাঁদের জন্য কি খাবারদাবার বা জীবনযাপনের পরিবর্তনের কোনো পরামর্শ থাকে?

উত্তর : অন্যদের তুলনায় তাঁরা একটু প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি খাবেন। আর যাঁরা একটু অগ্রবর্তী পর্যায়ে চলে গিয়েছেন অসুখের, তাঁদের লবণ খাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা একটু সীমাবদ্ধতা রাখি। তাঁরা খাওয়ার সঙ্গে বাড়তি লবণ খাবেন না। এ ছাড়া কার্বোহাইড্রেট বা অন্যান্য যে খাবারদাবার, ফলসহ স্বাভাবিক খেতে পারবে।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *