13. ল্যাসিক কি? কাদের জন্য জরুরী

Laser Assisted In-Situ Keratomileusis এর সংক্ষিপ্ত নাম হচ্ছে LASIK, যাদের চোখে পাওয়ারজনিত সমস্যার কারণে চশমা বা কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করতে হয়, তারা ল্যাসিক অপারেশন করিয়ে চশমা বা কন্টাক্ট লেন্সের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। বিশেষ করে যারা সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে চান কিংবা শোবিজ জগতে প্রতিষ্ঠা পেতে চান তাদের জন্য ল্যাসিক এক সুবর্ণ সুযোগ।

ল্যাসিক কি?

 চোখের ল্যাসিক
চোখের ল্যাসিক

আমাদের চোখের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই একটি লেন্স থাকে। ক্যামেরা বা টেলিস্কোপের লেন্স সামনে পেছনে সরিয়ে ফোকাস করতে হয়। কিন্তু চোখের লেন্সের ফোকাস করার পদ্ধতিটি ভিন্ন। চোখের লেন্স তার আকার বদলাতে পারে। চোখের পেশীর মাধ্যমে এই আকার বদলানোর কাজটি হয়।

ফলে ফোকাসিং এর মাধ্যমে আমরা কাছের বা দূরের যেকোন জিনিস দেখতে পাই। বিপত্তি ঘটে চোখের এই লেন্সের ফোকাসিং ক্ষমতা কমে গেলে বা বেড়ে গেলে। কাছের বা দূরের বা উভয়ক্ষেত্রেই চোখের লেন্স ব্যবহার করে স্পষ্ট দেখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তখন বাইরে থেকে লেন্স ব্যবহার করতে হয় চোখের প্রাকৃতিক লেন্সকে সাহায্য করার জন্য। এটা চশমা বা কন্টাক্ট লেন্স হতে পরে।

তবে লেজার রশ্নি ব্যবহার করে কর্ণিয়ার কিছু অংশ তুলেও কাজটি করা যায়। নতুন গঠনের কর্ণিয়া লেন্সের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তখন আর চশমা প্রয়োজন হয় না। রোগী চশমা ছাড়াই স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারেন।

কখন এবং কাদের ল্যাসিক অপারেশন করা যায়?

মাইনাস বা প্লাস দু’ধরনের পাওয়ারের ক্ষেত্রেই ল্যাসিক চিকিৎসা দেয়া যায়।

যেসব ক্ষেত্রে ল্যাসিক অপারেশন করানো যায়:

  • ক্ষীণ দৃষ্টি বা মায়োপিয়ায় পাওয়ার -২.০০ থেকে -২০.০০ ডায়াপ্টার এর মধ্যে হলে।
  • দূরদৃষ্টি বা হাইপারমেট্রোপিয়ার ক্ষেত্রে পাওয়ার +২.০০ থেকে +৮.০০ এর মধ্যে হলে।
  • বিষমদৃষ্টি বা অ্যাসটিগম্যাটিজম এর ক্ষেত্রে পাওয়ার ১.০০ থেকে ৭ ডায়াপ্টার এর মধ্যে হলে।

১৮ বছরের আগে ল্যাসিক অপারেশন করানো উচিত নয়, এসময় চোখের পাওয়ার দ্রুত বদলায়।

যেসব অবস্থায় ল্যাসিক অপারেশন করানো যায় না:

  • যাদের চোখের পাওয়ার স্থিতিশীল হচ্ছে না, দ্রুত বদলাচ্ছে তাদেরও ল্যাসিক অপারেশন করা হয় না।
  • রেটিনায় সমস্যা, চোখে গ্লুকোমা, ছানি বা অন্য কোন ভাইরাসজনিত অসুখ থাকলে ল্যাসিক করানো যায় না।
  • এইচ আই ভি, রিউমাটয়েড, অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিস, আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি রোগ থাকলে ল্যাসিক অপারেশন করানো যায় না।
  • লেজারের কারণে ভ্রূণের ক্ষতি এড়ানোর জন্য গর্ভবতী মহিলাদেরও ল্যাসিক অপারেশন করা হয় না।

প্রস্তুতি

ল্যাসিক অপ্যারেশনের আগে একট পরীক্ষা করাতে হয়, একে প্রি-ল্যাসিক টেস্ট বলা হয়। রোগীকে আদৌ ল্যাসিক চিকিৎসা দেয়া যাবে কিনা এ পরীক্ষার মাধ্যমে সেটি দেখা হয়।

এ পরীক্ষার আগে কয়েকদিন কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হয়।

অপারেশনের দিন সকালে হালকা খাবার এবং ওষুধ (যদি দেয়া হয়ে থাকে) খেয়ে হাসপাতালে যেতে বলা হয়। চোখের মেকআপের জন্য কোন উপকরণ এসময় ব্যবহার করা উচিত নয়।

অপারেশন পদ্ধতি:

কর্ণিয়াকে অবশ করে এ অপারেশন করা হয় বলে রোগী ব্যথা অনুভব করেন না। কর্ণিয়ার একটি পাতলা স্তর তৈরি করে সেটি উল্টে রাখা হয়। এরপর ১৫ থেকে ৬০ সেকেন্ড লেজার প্রয়োগ করা হয়। কিভাবে কতটা সময় লেজার প্রয়োগ করা হবে সেটা পাওয়ারের ওপর নির্ভর করে এবং কম্পিউটারের সাহায্যে তা হিসাব করে নেয়া হয়। পুরো অপারেশনে ১০ মিনিটের মত সময় লাগে। ১৫ থেকে ৩০ মিনিট  অবস্থানের পর রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করতে পারেন।

প্রথম দিন রোগী কিছুটা ঝাপসা দেখতে পারেন, কয়েকেদিনের মধ্যেই রোগী অপারেশনের কার্যকারিতা বুঝতে পারেন। তবে পুরো ফল পেতে এক মাস লেগে যেতে পারে। ল্যাসিকের সময় এবং পর রোগী দুই-তিন ঘন্টা চোখে কিছুটা ব্যথা ও চাপ অনুভব করতে পারেন।

প্রয়োজনে কয়েক বছর পর আবার ল্যাসিক করানো যায়।

ফলোআপ:

২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পুনরায় রোগীকে পরীক্ষা করা হতে পারে এবং ছয় মাস পর পর রোগীকে পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনে চশমা বা কন্টাক্ট লেন্স দেয়া হতে পারে।

সাধারণত রোগীর অবস্থা বুঝে কিছু চোখের ড্রপ নিতে বলা হয় কিছুদিন পর পর ড্রপ বদলও করা হতে পারে।

জটিলতা

ল্যাসিকের মাধ্যমে কর্ণিয়ায় যে পরিবর্তন আনা হয়, তা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না।

৯৯ ভাগ ক্ষেত্রেই ল্যাসিক অপারেশন সফল। তবে অনেকসময় কিছু জটিলতাও দেখা দেয়। সূর্যের আলোয় অসুবিধা, চোখ শুকিয়ে আসা, চোখে রংধনু দেখা, কালার ভিশন কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মাঝে কিছুদিন দৃষ্টির ওঠানামা বা পাওয়ারের দ্রুত হ্রাসবৃদ্ধি ঘটতে পারে। এরকম সমস্যা হলে সেটা চিকিৎসককে জানানো উচিত, তিনি সে মোতাবেক ওষুধ দিতে পারেন।

চল্লিশের পরে ল্যাসিক

বার্ধক্য জনিত সমস্যায় ল্যাসিকের পদ্ধতি একটু ভিন্ন হতে পারে। কারণ এসময় অনেকেরই কাছে এবং দূরে দেখা দুক্ষেত্রেই পাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ল্যাসিক অপারেশনের মাধ্যেমে কেবল একটি পাওয়ার ঠিক করা যায়।

এ সমস্যার একটি সমাধান হচ্ছে মনোভিশন। অর্থাৎ ল্যাসিকের মাধ্যমে রোগীর দু’চোখে দু’রকম পাওয়ারের ব্যবস্থা করা। রোগী এক চোখে কাছের জিনিস দেখেন এবং অন্য চোখে দূরের জিনিস দেখেন।

আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে দু’চোখেই দূরে দেখার ব্যবস্থা করা। দূরে দেখার জন্য ল্যাসিক করালে কাছে দেখার জন্যও পাওয়ার অর্ধেক হয়ে যায়।

চিকিৎসক নন, রোগীই সিদ্ধান্ত নেন কোন পদ্ধতি তিনি ব্যবহার করবেন।

বিতর্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন যখন ল্যাসিক সার্জারির অনুমোদন দেয় তখন এটা নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়েছিল। পরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ল্যাসিকের পর রোগীদের বিভিন্ন জটিলতার কথা বলে আরও বিতর্ক হয়েছে।

ল্যাসিক একেবারে ঝুঁকিমুক্ত কোন অপারেশন নয়, ল্যাসিক করানোর আগে হাসপাতালটি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেয়া উচিত।

কোথায়?

ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত হারুন আই ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, মিরপুরের ওএসবি লেজার ভিশন সেন্টার, গুলশানের ল্যাসিক সাইট সেন্টার এসব জায়গায় ল্যাসিক অপারেশনের ব্যবস্থা আছে।