হেপাটাইটিস প্রতিরোধ একটি পর্যালোচনা

বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২৫৭ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস “বি” ও প্রায় ৭১ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস “সি” ভাইরাসে আক্রান্ত। ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ হেপাটাইটিস “বি” আক্রান্ত লোকদের মধ্যে মাত্র ৯ ভাগ ও হেপাটাইটিস “সি” আক্রান্ত লোকদের মধ্যে মাত্র ২০ভাগ লোকের পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় হয়েছে। এছাড়া আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মাত্র ৮ ভাগ হেপাটাইটিস “বি” এবং মাত্র ৭ ভাগ হেপাটাইটিস “সি” রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। হেপাটাইটিস “বি” এবং “সি” ভাইরাসের আক্রান্ত ৯০ শতাংশ রোগীই চিকিৎসার বাইরে থাকছে। শুরুতে হেপাটাইটিস চিকিৎসা না করলে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরী। হেপাটাইটিস নির্মূল করতে হলে রোগের উপসর্গ ও চিকিৎসা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে আমাদের।

হেপাটাইটিস শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রীক শব্দ “হিপার ” ( Hepar) যার অর্থ লিভার (Liver) এবং ল্যাটিন শব্দ আইটিস (Itis) যার অর্থ প্রদাহ (Inflammation)। অর্থাৎ হেপাটাইটিস বলতে বুঝায় লিভার কোষের গঠনগত পরিবর্তন ও প্রদাহ ।

আমেরিকান হেরিটেইজ ডিকশনারী (American Heritage Dictionary) অনুসারে হেপাটাইটিস হল লিভারের প্রদাহ যার কারণ সংক্রামক বা বিষক্রিয়ার দ্বারা জন্ডিস, জ্বর, লিভার ইনলার্জ এবং পেটের বেদনা প্রভৃতি ।

হেপাটাইটিসের প্রকারভেদ – ১. হেপাটাইটিস ‘ এ ‘ ভাইরাস ২. হেপাটাইটিস ‘ বি ‘ ভাইরাস ৩. হেপাটাইটিস ‘ সি’ ভাইরাস ৪. হেপাটাইটিস ‘ ডি’ ভাইরাস এবং ৫. হেপাটাইটিস ‘ ই ‘ ভাইরাস ইত্যাদি।

হেপাটাইটিস ‘ এ ‘ ভাইরাস – হেপাটাইটিস ‘ এ ‘ ভাইরাস বিভিন্ন ধরনের দূষিত খাদ্য ও পানীয় থেকে সংক্রামিত হয় । এছাড়া এনাল ওরাল (Anal-oral Sex) ক্ষেত্রে সংক্রামিত হয়ে থাকে । এই ভাইরাস এর কারনে লিভার প্রদাহ হতে পারে। হেপাটাইটিস ‘ বি ‘ ভাইরাস – হেপাটাইটিস ‘ বি ‘ ভাইরাস ছড়ায় সংক্রামিত ব্যক্তির রক্ত, সিমেন অথবা শরীরের অন্যান্য তরল পদার্থ এবং বহুগামী যৌন সংগমের মাধ্যমে এ রোগ হতে পারে। ১) সহবাসের সময় সংক্রামিত ব্যক্তি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করলে। ২) একই সুঁই একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে। ৩) আক্তান্ত ব্যক্তির দৈনন্দিন ব্যবহত জিনিসপত্র যেমন ট্রুথব্রাশ, রেজার এবং কাপড় ইত্যাদি হতে । ৪) আক্রান্ত নারী বাচ্চা জন্ম এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে ছড়ায় । ৫) ট্যাটু অথবা বডি পিয়ারচিং করার সময় নোংরা সুঁই এবং যন্ত্রপাতি ব্যবহার থেকে হয়। ৬) হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের কারণে মারাত্মকভাবে সংক্রামিত হয় । যার ফলে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে ।

হেপাটাইটিস ‘ সি’ ভাইরাস – হেপাটাইটিস ‘ সি’ ভাইরাস প্রায় হেপাটাইটিস “ বি ” ভাইরাস এর অনুরুপ । এই ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত সিমেন অথবা শরীরের অন্যান্য তরল পর্দার্থ থেকে ছড়ায়। হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের কারণে লিভার ইনলার্জ ডেমেজ হয় এবং এমনকি ক্যান্সার হতে পারে । অধিকাংশ ব্যক্তির লিভারে ক্রনিক ইনফেকশন ডেভেলপ করে এবং লিভার সিরোসিস হয়।

হেপাটাইটিস “ ডি ” ভাইরাস – হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হেপাটাইটিস ডি ভাইরাস হয়ে থাকে । এই ভাইরাস সংক্রামিত ব্যক্তির রক্ত, একাধিক ব্যবহৃত সুঁই এবং সংক্রামিত ব্যক্তির সাথে যৌন সংগমের মাধ্যমে ছড়ায় । এই ভাইরাসের কারণে লিভার এনলার্জ হয়ে থাকে ।

হেপাটাইটিস “ই“ ভাইরাস – হেপাটাইটিস ‘ ই ’ ভাইরাস দূষিত পানীয় থেকে সংক্রামিত হয়ে থাকে । এই ভাইরাস ওরাল এনাল কনট্রাক্ট (Oral-anal Contact) এর মাধ্যমে ছড়াতে পারে। এই ভাইরাসের কারণে লিভার এনলার্জ হতে পারে ।
হেপাটাইটিসের কারণ –
ক) মায়াজমেটিক কারণ – (১) সোরা (২) সিফিলিস (৩) সাইকোসিস (৪) টিউবারকুলার ডায়াথোসিস
খ) আনুসঙ্গিক কারণ – (১) ভাইরাস- হেপাটাইটিস ‘ এ ‘ ভাইরাস; হেপাটাইটিস ‘ বি ‘ ভাইরাস ; হেপাটাইটিস ‘ সি’ ভাইরাস ; হেপাটাইটিস ‘ ডি’ ভাইরাস ; হেপাটাইটিস ‘ ই ‘ ভাইরাস (২) ছোঁয়াচে (একের থেকে অন্যের ) মল মূত্র থেকে হতে পারে ।

সরাসরি মুখ থেকে যেমন এক গ্লাসে পানি খাওয়া বা আক্রান্ত ব্যক্তির মুখে চুমু খাওয়া; পরোক্ষভাবে আসতে পারে যেমন কাপড় চোপড় থেকে আসতে পারে । (৩) ঘনবসতি এলাকায় যদি আক্রান্ত ব্যক্তি থাকলে তাহলে ছড়াতে পারে । (৪) শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয় । (৫) সহজে পানি , দুধ এবং সীল মাছ ইত্যাদি মাধ্যমে সহজে ছড়ায় । (৬) অস্বাস্থ্যকর পরিবেশজনিত কারণে । (৭) রক্ত দেওয়া ও নেওয়ার মাধ্যমে । (৮) টক্সিন সাবস্টেন্স – (ক) টেট্রা সাইক্লিন (খ) প্যারাসিটামল (গ) এ্যালকোহল (ঘ) কার্বো টেট্রা ক্লোরাইড।

হেপাটাইটিসের ক্লিনিক্যাল ফিচার –
লক্ষণ (Symptom ) – ১) অত্যাধিক দুর্বলতা । ২)কম্পন , ক্ষুধামন্দা । ৩) বমি বমি ভাব ও বমি । ৪) ডায়ারিয়া । ৫) ডান হাইপোকান্ড্রিয়াক অঞ্চলে ব্যথা । ৬) সমস্ত শরীরে ব্যথা । ৭) মাথা ব্যথা । ৮) ওজন হ্রাস পায় । ৯) প্র¯্রাব হলুদ হয় । ১০) ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায় ।

সাইন বা চিহ্ন : – ১) জন্ডিস থাকতে পারে । ২) শরীরে আমবাত । ৩) নাক দিয়ে রক্তস্রাব । ৪) রক্ত স্বল্পতা । ৫) লিভার স্থান স্পর্শকাতর । ৬) সার্ভাইক্যাল লিস্ফনোড বৃদ্ধি পেতে পারে ।৭) জ্বর থাকতে পারে ।৮) স্প্লীন (Spleen) বড় হয় ।
রোগানুসন্ধান ( Investigation ) – Blood CBC ; Serrum Bilirubin test ; LFT ; USG of W/A ; Urine R/E ; Liver biopsy, HBsAg (ELISA)

জটিলতা (Complication) ১) লিভার সিরোসিস । ২) ক্রনিক পারসিসটেন্টে হেপাটাইটিস হতে পারে। ৩) এসাইটিস , ইডিমা , ড্রপসি । ৪) ক্যান্সার হতে পারে । ৫) হেমোরেজ । ৬) ব্্রঙ্কাইটিস। ৭) হেপাটিক ফেইলিউর ।
যদি উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহন করতে ব্যর্থ হয় কোন কোন ক্ষেত্রে লিভার সেলগুলোর অস্বাভাবিকতার কারণে লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে। এমনকি লিভার ক্যান্সার ও হতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে রোগী মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।

ব্যবস্থাপনা (Management ) –
(১) ঔষধ (Medicine) – লক্ষন অনুযায়ী ইউনানী বা ভেষজ চিকিৎসা দিতে হবে।
(২) উপদেশ (Advice) –

করণীয় -সম্পূর্ণ বিছানায় বিশ্রাম নিতে হবে । তরল খাদ্য বেশী খেতে হবে।
নিষেধ -ধুমপান ও মদ্যপান, সকল প্রকার চর্বি জাতীয় খাবার, রাত্রী জাগরণ, মাছ মাংস খাওয়া, গুরুপাক খাবার নিষেধ ।
পথ্য – চর্বিবিহীন খাবার ; টাটকা শাক সবজি ও ফলমূল ; উচ্চ পেপটিনযুক্ত খাবার ; ডাবের পানি ; ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ও ভিটমিন সি। সহজপাচ্য খাদ্য খাবার গ্রহন করবেন যেমন – লাউ, পটল, পেপে ঝিঙা, কালো ছোট মাছের ঝোল।

সচেতনতা ও প্রতিরোধ
১) নিরাপদ খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা। ২) খাবার আগে ও মল ত্যাগের পর ভালভাবে হাত ধোয়া। ৩) প্রতিরোধক টিকা গ্রহণ করা। ৪) নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করা। ৫) নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন। ৬) নিরাপদ যৌন সঙ্গম ৭) পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ৮) অন্যের দৈনন্দিন ব্যবহৃত জিনিস পত্র যেমন টুথব্রাশ, রেজার, কাপড় ইত্যাদি না ব্যবহার করলে ৯) আক্রান্ত নারীর দুধ বাচ্চাকে না খাওয়ালে। ১০) স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা।১১) লোক সমাগমে মাস্ক ব্যবহার করা।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *